প্রসাশনের শিথিল নজরদারি , শিল্পবর্জ্য দূষিত করছে জলাশয়

টাঙ্গাইলের মিল ও কারখানাগুলোর রঙ ও মুদ্রণ ইউনিট থেকে অপরিশোধিত এবং সম্ভাব্য ক্ষতিকর শিল্পবর্জ্য নিষ্কাশনের ফলে জেলার নদী ও অন্যান্য জলাশয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে আসছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শিথিল নজরদারির কারণে এ দূষণ অব্যাহত রয়েছে, যা পরিবেশের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় জনগণের জীবন ও জীবিকা এবং জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। টাঙ্গাইলের পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মির্জাপুর উপজেলার গড়াই শিল্প এলাকায় ১৫টিরও বেশি মিল ও কারখানা রয়েছে। এছাড়া সদর উপজেলার বিসিক শিল্প এলাকা এবং সংলগ্ন ক্ষুদিরামপুরে আরও দুটি মিল রয়েছে। সূত্র অনুযায়ী এসব মিল ও কারখানায় ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ETP) রয়েছে, যা শিল্পবর্জ্য পরিশোধনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই এই প্ল্যান্টগুলো যথাযথভাবে চালু রাখছে না।

সাম্প্রতিক এক পরিদর্শনে দেখা গেছে, মির্জাপুর উপজেলার সোহাগপাড়া ও পাকুল্লা খালের পানি দূষণের কারণে পিচকালো হয়ে গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, বেশিরভাগ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনো নিয়ম অনুযায়ী এবং যথাযথ ক্ষমতা অনুসারে ইটিপি স্থাপন করেনি। যারা ইটিপি স্থাপন করেছে, তারাও ব্যয় কমানোর জন্য এগুলো সচল রাখছে না। ফলে কারখানাগুলো তাদের অপরিশোধিত বিষাক্ত বর্জ্য সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে নদী ও খালে ফেলে দিচ্ছে। পরিবেশ ও মানবাধিকার কর্মী শামসুল আলম জানান, “ইটিপিগুলো কেবলমাত্র লোক দেখানো। আশেপাশের নদী ও খালের পানির অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়, এই শিল্পগুলো কীভাবে জলাশয়গুলোকে বিষাক্ত করে তুলছে।”

লৌহজং নদী, যা টাঙ্গাইল সদর উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, গত কয়েক দশকে মারাত্মক শিল্পদূষণের শিকার হয়েছে। বিশেষ করে তারটিয়া, গোসাইবাড়ী কুমুল্লি, ক্ষুদিরামপুর, করটিয়া এবং বীরপুষিয়া এলাকার মিল ও কারখানাগুলোর বর্জ্য নদীটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অবৈধ দখলদারিত্বও নদীটির সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শুষ্ক মৌসুমে এই বর্জ্য জমে থাকে, পরে বর্ষায় তা ধুয়ে গিয়ে অন্যান্য জলাশয় ও নদীগুলোকে দূষিত করে। ফলে, শুধু টাঙ্গাইল নয়, আশেপাশের অঞ্চলের পানির গুণগত মানও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গোসাইবাড়ী কুমুল্লি এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহিম মোল্লা বলেন, “আমরা বারবার নদী ও জলাশয়ের দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছি, কিন্তু কেউ আমাদের কথা শোনেনি।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, দূষণের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরা অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং তারা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে নিজেদের রক্ষা করছে। এই কারণে প্রশাসন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ক্ষুদিরামপুর এলাকার বাসিন্দা শিপন আহমেদ বলেন, “এই বিষয়টি বারবার গণমাধ্যমে উঠে এলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।” এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে, টাঙ্গাইল পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিয়া মাহমুদুর রহমান বলেন, টাঙ্গাইলে কোনো পানি পরীক্ষাগার না থাকায় তারা প্রতি কয়েক মাস পরপর মিল ও কারখানার পানির নমুনা ঢাকায় পাঠান পরীক্ষার জন্য। তিনি বলেন, “আমরা সম্প্রতি কিছু জলাশয় থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছি। যদি দূষণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট মিল ও কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

পরিবেশবাদীরা মনে করেন, টাঙ্গাইলে শিল্পদূষণ রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। নদী ও জলাশয় রক্ষা আন্দোলন কমিটির সাধারণ সম্পাদক রতন আহমেদ সিদ্দিকী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “পরীক্ষার ফলাফল বিকৃত করে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হতে পারে। তাই এই পরীক্ষাগুলোর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।” দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য মিল ও কারখানাগুলোকে তাদের ইটিপি যথাযথভাবে চালানোর জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা প্রয়োজন।প্রশাসনকে নিয়মিত পানি পরীক্ষার পাশাপাশি দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দূষণ প্রতিরোধে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে এবং তাদের অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করতে হবে। নদী ও খালের অবৈধ দখলদারিত্ব বন্ধ করতে হবে এবং দূষিত জলাশয়গুলো পুনরুদ্ধারের জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।

টাঙ্গাইলে শিল্পদূষণ এখন একটি মহামারির রূপ নিয়েছে। কর্তৃপক্ষের শিথিল ভূমিকা এবং প্রভাবশালীদের দুর্নীতির কারণে পরিবেশ ও জনজীবন চরম সংকটের মুখে পড়েছে। এই সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। নতুবা, টাঙ্গাইলের নদ-নদী ও জলাশয়গুলো একে একে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, যেটা শুধু পরিবেশ নয়, সামগ্রিকভাবে জনগণের জীবনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন