বাংলাদেশে কর্মরত আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে জরুরি ও সাহসী বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে তারা একথা জানিয়েছে, “বিশ্ব আমাদের সময়ের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকটকে ভুলে যাওয়ার বিলাসিতা বহন করতে পারে না। এখন সময় এসেছে এমন একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার, যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং স্বাগতিক জনগোষ্ঠী অনিশ্চয়তার মধ্যে নয় বরং নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা পাবে,”।
এই বিবৃতিতে একাত্মতা প্রকাশ করেছে ACF, ActionAid, Cordaid, Concern Worldwide, DRC, Handicap International, International Rescue Committee, Islamic Relief, Oxfam, Plan International, Save the Children এবং World Vision-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। তারা বলেছে, রোহিঙ্গা সংকট শুধু একটি সম্পদের সংকট নয়, এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার সংকট। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই এই সংকটের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও বিনিয়োগ করতে হবে। এই বিবৃতি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বাংলাদেশ সফরের সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যা এই সংকটের প্রতি বৈশ্বিক দৃষ্টি আকর্ষণের একটি প্রচেষ্টা।
“রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার জন্য মানবিক সহায়তার অর্থায়ন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে এবং বৈশ্বিক অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই নতুন ও টেকসই আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি জরুরি হয়ে পড়েছে,” বিবৃতিতে বলা হয়েছে। তারা অবিলম্বে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে জীবন রক্ষাকারী সহায়তা বজায় রাখা, নতুন কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণ এবং কক্সবাজারে অবস্থানরত এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্থিতিশীলতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা যায়। তহবিলের ঘাটতির ফলে এপ্রিল থেকে খাদ্য রেশন অর্ধেকে নেমে আসবে, যা স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলবে। খাদ্য ও পুষ্টি, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (WASH), নিরাপত্তা, আশ্রয় এবং জীবিকা সহায়তার মতো মৌলিক সেবাগুলো চরম সংকটে পড়েছে।
“জরুরি সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছাড়া, এই সংকট অগ্রহণযোগ্যভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যেতে পারে। আট বছরে গড়ানো এই সংকট বাংলাদেশের সম্পদের ওপর বিরাট চাপ সৃষ্টি করেছে, যখন বিশ্বব্যাপী অন্যান্য সংকটের কারণে দাতাদের প্রতিশ্রুতি কমে আসছে,” বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতির স্বাক্ষরকারীরা বলেছেন, এই সংকট মোকাবিলার জন্য জাতিসংঘ, বাংলাদেশ সরকার, উন্নয়ন অংশীদার, আন্তর্জাতিক এনজিও, স্থানীয় এনজিও এবং প্রধান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের নিয়মিত সংলাপ প্রয়োজন। “সহায়তা প্রদানের বর্তমান মডেলকে আরও টেকসই, দীর্ঘমেয়াদি ও সহনশীলতাভিত্তিক কৌশলে রূপান্তরিত করতে হবে, যেখানে জীবিকা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং অর্থনৈতিক সুযোগ অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্বাগতিক জনগোষ্ঠী উভয়ই উপকৃত হতে পারে,” তারা যোগ করেন।
তারা আরও বলেন, মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী ‘ট্রিপল নেক্সাস অ্যাপ্রোচ’ গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে নির্ভরশীলতা কমানো যায় এবং আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ানো সম্ভব হয়। International Rescue Committee-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিনা রহমান বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট শুধু সম্পদের সংকট নয়, এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার সংকট। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই টেকসই সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে বিনিয়োগ করতে হবে।”
ActionAid Bangladesh-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, “যদি এখনই কার্যকর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে আমরা রোহিঙ্গা সংকটকে একটি বিস্মৃত ট্র্যাজেডিতে পরিণত হতে দেব। জীবিকা, দক্ষতা এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করে একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করাই সঠিক পথ।” Oxfam Bangladesh-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর আশীষ দামলে বলেন, “এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যাওয়ায়, আমরা বৈশ্বিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানাই যে, একটি কাঠামোগত ও নিবেদিত মিশন গঠনের মাধ্যমে টেকসই সাড়া নিশ্চিত করা হোক।”


