“…বাংলাদেশে ধর্ষণের দৃশ্যমান কোনো বিচার হয় না। যেমন ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পুলিশের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে যত ধর্ষণের মামলা হয়েছিল, তার মধ্যে রায় ঘোষণার হার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং সাজার হার শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ (বাংলা ট্রিবিউন, ২০১৭)। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বেহাল দশা, আইনি ও পুলিশি ব্যবস্থার ঔপনিবেশিক খাসলত, দিনের পর দিন মামলার হয়রানি, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনের ভেতরকার সংকট—সব মিলিয়ে বিচারহীনতার এমন এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে যে জনগণের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়ে আছে, এ রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব নয়।
জনগণের মধ্যে যখন এমন ধারণা দৃঢ় হয়, তখন তারা একদিকে ফাঁসির মতো সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করে, অন্যদিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে ধর্ষকের মৃত্যু হলে উল্লসিতও হয়। ক্রসফায়ারের পক্ষে সম্মতি উৎপাদনে ‘ধর্ষণ’কে ব্যবহার করার নজির আমরা দেখেছি আওয়ামী শাসনামলে। … আইন-আদালতে ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয় এবং পৃথিবীতে এমন অনেক নজির আছে, যেখানে বহু বছর পর কাউকে নির্দোষ প্রমাণিত হতেও দেখা গিয়েছে। কিন্তু শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে ভুল শোধরানোর আর কোনো উপায় থাকে না। … শুধু ধর্ষণ কেন, পৃথিবীতে কোনো অপরাধই মৃত্যুদণ্ডের কারণে কমেছে, এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।…অনেকেই বলে থাকেন, ধর্ষণের সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড হলে ধর্ষণের পর হত্যা করার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেতে পারে। মৃত্যুদণ্ডকেন্দ্রিক এ আলোচনা নারীর প্রতি সহিংসতার কাঠামোগত বিভিন্ন দিক রয়েছে এবং তার সঙ্গে ধর্ষণের সম্পর্ককে উপেক্ষা করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও যদি আমরা আমলে নিই, তাহলে দেখব যে এখানে দুটো ঘটনা খুব বেশি ঘটে। একদিকে প্রচুর ভুয়া ধর্ষণের মামলা হয় এবং অন্যদিকে বিভিন্ন কারণে ঘটনা ‘নথিভুক্ত’ করার প্রবণতাও কম। ভুক্তভোগীকে থানায় গিয়ে মামলা করতে গেলে যে ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বা সামাজিক চাপে ঘটনাকে তারা চেপে যান, হয়তোবা নানাবিধ ‘আপস’ করতে বাধ্য হন। …. যেহেতু প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড, সেহেতু নানা চাপ দিয়ে আপসে মিটমাট করার চেষ্টাই বেশি করা হবে আমাদের সমাজবাস্তবতায়। অন্যদিকে এটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ‘ধর্ষণ’ মামলাকে ব্যবহারের প্রবণতাও বৃদ্ধি করবে।
… ধর্ষণের সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড—এ ধারণার গোড়ায় রয়েছে এক পুরুষতান্ত্রিক পূর্বানুমান। ধর্ষণ যেন হত্যা বা খুনের চেয়ে ভয়াবহ এক পরিণতি। ‘ইজ্জত’-এর পুরুষতান্ত্রিক ধারণা থেকে এটার জন্ম হয়, নারীর জীবনে ধর্ষণই সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা এবং ধর্ষণের শিকার হওয়ার মাধ্যমে নারীর ‘ইজ্জত’ ভূলুণ্ঠিত হয়। সে নারীর যেন সমাজে আর কোনো স্থান নেই। জীবনের চেয়ে ‘সতীত্ব’কে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। … এমন সংকটকালীন মুহূর্তে বহু জনতুষ্টিবাদী দাবি উঠতে পারে, যেগুলো পরবর্তী সময়ে নিপীড়নমূলক হাতিয়ার হয়ে উঠবে। নিপীড়নমূলক সব আইনের ন্যায্যতা উৎপাদন করা হয়ে থাকে এমন সংকটের অজুহাতেই।
… বিচারপ্রক্রিয়াকে ধীর করে বা খোদ ভুক্তভোগীর জন্য বিচার পাওয়াকে কঠিন করে তোলে বা ভুক্তভোগীকে আরেক দফা ভিকটিমে রূপান্তর করে, সেগুলোকে তাড়াতে হবে। বিচারব্যবস্থাকে সচল করতে হবে। বিচারব্যবস্থায় যত গাফিলতি হবে, তত বেশি সমাজে আরও ‘কঠোর’ দাবির উত্থাপন ঘটতে থাকবে। এমনকি ‘ক্রসফায়ার’ হাজির হতে পারে এ অছিলায়। ইনসাফের দাবিকে কোনো বে-ইনসাফির উপলক্ষ হয়ে উঠতে দেওয়া যাবে না। “


