নিওলিবারেলিজম একটি বহুব্যাখ্যাযোগ্য ধারণা, যার উৎপত্তি একদিকে যেমন ২০শ শতকের ইউরোপীয় বৌদ্ধিক আন্দোলনের ফাঁকে, অন্যদিকে তেমনি এটি ১৯৭০-৮০ এর দশকে অ্যাংলো-আমেরিকান রাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক মতাদর্শ নয়, রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তির সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের একটি রাজনৈতিক প্রকল্পও বটে। এই প্রবন্ধে নিওলিবারেলিজমের ইতিহাসকে তিনটি স্তরে বিশ্লেষণ করা হয়েছে: ইউরোপীয় বৌদ্ধিক সূত্র, অ্যাংলো-আমেরিকান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং লাতিন আমেরিকান অভিজ্ঞতা।
নিওলিবারেল আদর্শ প্রথম গড়ে ওঠে ২০ শতকের প্রথমভাগে, এমন এক সময়ে যখন সাম্রাজ্যিক কাঠামো ভেঙে পড়ছিল এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিশ্বজুড়ে শক্তি অর্জন করছিল। ঐতিহাসিক কুইন স্লোবোডিয়ানের গবেষণা, Globalists: The End of Empire and the Birth of Neoliberalism (২০১৮), এই প্রবণতাকে বিশ্লেষণ করে দেখান যে ইউরোপীয় এলিটরা, বিশেষত অস্ট্রিয়ান অর্থনীতিবিদ লুডভিগ ভন মিসেস এবং ফ্রেডরিখ হায়েক, বিশ্বাস করতেন যে উদীয়মান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই তারা এমন এক বিশ্বব্যবস্থা কল্পনা করেন যেখানে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও আইন ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করবে।
মন্ট পেলেরিন সোসাইটি, জেনেভার লীগ অব নেশনস বা ভিয়েনা চেম্বার অফ কমার্সের মত প্রতিষ্ঠানগুলির আর্কাইভে প্রবেশ করে ইউরোপীয় ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন যে নিওলিবারেল চিন্তাধারা “মার্কেট সেভিং” মিশনের ওপর গঠিত, যা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে জাতির নাগরিকত্ব ধারণার বিরোধী ছিল। ইউরোপের তুলনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিওলিবারেলিজমের ইতিহাস অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক এবং রাজনৈতিকভাবে অধিক স্পষ্ট। ঐতিহাসিক গ্যারি গারস্টলের মতে, নিওলিবারেল অর্ডারের বিকাশ শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকে, যখন কেইনসীয় রাষ্ট্র মুদ্রাস্ফীতি, মন্দা এবং রাজনৈতিক বৈধতার সংকটে ভুগছিল। এই সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে, রোনাল্ড রেগান ও মার্গারেট থ্যাচারের মতো নেতারা সরকারী নিয়ন্ত্রণ থেকে বাজারকে মুক্ত করার প্রকল্প শুরু করেন। বিশ্বব্যাপী এই প্রকল্পকে সহায়তা করেছিল GATT, IMF, এবং WTO-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, যা একধরনের সুপ্রান্যাশনাল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে।
তবে মার্কিন বৌদ্ধিক পরিসরে একধরনের ঐকমত্য তৈরি হয়েছে যে নিওলিবারেলিজমের সেই যুগ এখন শেষ হয়েছে। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হামলা, গণতন্ত্রের ওপর আক্রমণের চিত্র হিসেবে, নিওলিবারেল রাজনৈতিক সর্বসম্মতির অবসানকে চিহ্নিত করে। ইউরোপীয় ও মার্কিন ইতিহাসের বিপরীতে, লাতিন আমেরিকা নিওলিবারেল নীতির প্রয়োগক্ষেত্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবভিত্তিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। চিলির পিনোশে শাসন, মেক্সিকোতে বেসরকারিকরণ এবং বলিভিয়ায় জলের অধিকার সংকট—সবই নিওলিবারেল নীতিমালার উদাহরণ। তবু মার্কিন একাডেমিক গবেষণাগুলিতে এই অঞ্চলের অনুপস্থিতি লক্ষণীয়, যা একটি স্পষ্ট নস্টালজিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে: মনে করা হয় যেন একসময় নিওলিবারেল সময় ছিল এবং এখন তা নেই।
এটা ভুলে যাওয়া হয় যে ‘নিওলিবারেলিজম’ শুধু একটি নীতির নাম নয়, এটি একটি অভিজ্ঞতা—যা অনেক জাতির মানুষের জন্য বৈষম্য, শোষণ এবং প্রতিরোধের বাস্তবতা বহন করে। যেমন মেক্সিকোতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা একজন লেখিকার অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, নিওলিবারেল শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় ছিল না, তা ছিল স্কুলের কাঠামো, মূল্যায়ন পদ্ধতি, এমনকি ছাত্রদের দায়িত্ববোধের মাধ্যমেও অনুরণিত।
নিওলিবারেলিজমের ইতিহাস একরৈখিক নয় বরং বহুস্তরীয়, ভূগোলভিত্তিক ও রাজনৈতিক পটভূমিসম্পন্ন পরিবর্তনশীল প্রকল্প। ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক বৃত্তে এর শিকড় থাকলেও, নিওলিবারেলিজম বাস্তবায়িত হয়েছে মূলত অ্যাংলো-আমেরিকান রাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে এবং তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে লাতিন আমেরিকার মতো অঞ্চলে। একাডেমিক আলোচনায় এই অঞ্চলগুলোর অন্তর্ভুক্তি নিছক উপস্থাপন নয়, ইতিহাসের বৈশ্বিক জটিলতাকে বোঝার একটি নৈতিক ও তাত্ত্বিক প্রয়োজন।
বর্তমান বিশ্বে যদি নিওলিবারেল যুগের পরবর্তী পর্যায়ে প্রবেশ করা হয়ে থাকে, তবে এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দিতে গেলে আমাদের সেই সব অঞ্চলের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিক্রিয়াকে কেন্দ্রে আনতে হবে, যারা নিওলিবারেল প্রকল্পের বাস্তবিক শিকার ও সমালোচক উভয়ই । প্রবন্ধটি একাডেমিক কনটেক্সটে আলোচনার উপযোগী। চাইলে আমি এটির জন্য রেফারেন্স বা ফুটনোট স্টাইলেও সাজাতে পারি। যদি চান, এটিকে PDF বা পাণ্ডুলিপি আকারে রূপান্তর করে দিতে পারি।


