.. ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র শাস্তিমূলক নীতি গ্রহণ করেছে। ট্রাম্পের পূর্বসূরি জো বাইডেন ক্রমেই কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, পাশাপাশি বিদ্রোহীদের ‘অপ্রাণঘাতী’ সামরিক সহায়তা প্রদান করেন, যারা সামরিক শাসন উৎখাত করতে চায়। ট্রাম্প প্রশাসন এখনো সেই নীতিই অনুসরণ করছে। … গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ানমার নীতি স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হয়েছে। নিষেধাজ্ঞাগুলো সামরিক সরকারকে খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়েছে। এতে যুদ্ধবাজ গোষ্ঠী, মানব পাচারকারী, মাদক ব্যবসায়ী, অস্ত্র চোরাচালানকারী এবং বন্য প্রাণী পাচারকারীরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
… মিয়ানমারের বিভক্ত প্রতিরোেধ বাহিনীগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দেশটির মানবাধিকার সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।বাস্তবতা হলো, সর্বশেষ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল এবার সেনাবাহিনীর নিপীড়ন থেকে নয়, বরং জান্তাবিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাত থেকে পালিয়ে আসছে। অতীতের দমন-পীড়নের জন্য পরিচিত মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে না গিয়ে রোহিঙ্গারা এখন বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। বিদ্রোহীদের হামলা এতটাই নিষ্ঠুর যে রোহিঙ্গা মিলিশিয়ারা এখন তাদের পুরোনো দমনকারীদের, অর্থাৎ সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে।
এদিকে মিয়ানমারে চীনের কৌশলগত প্রভাব আরও শক্তিশালী হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আরোপিত ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার ফলে মিয়ানমারের শাসকদের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই। ফলে তারা চীনের হাতে দেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ-প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ, মূল্যবান পাথর, রুবি ও জেডের মতো রত্নসম্পদ-শোষণের সুযোগ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও একই ভুল করেছে।মিয়ানমারের আগের সামরিক শাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র দুই দশকের বেশি সময় ধরে নিষেধাজ্ঞাভিত্তিক বিচ্ছিন্নকরণ নীতি অনুসরণ করেছিল। কিন্তু এর ফলে কোনো পরিবর্তন আসেনি; বরং এর ফলে চীনের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল।
পরে যখন তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করেন এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য উৎসাহ দেন, তখন পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। ২০১২ সালে ওবামা প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিয়ানমার সফর করেন। এর তিন বছর পর, অর্থাৎ ২০১৫ সালে দেশটি ৫০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি বেসামরিক সরকার নির্বাচন করে। … ২০১৪ সালে থাইল্যান্ড সেনাবাহিনীর প্রধান যখন ক্ষমতা দখল করেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে যোগাযোগ চালিয়ে যায়। এই নীতিই শেষ পর্যন্ত দেশটিতে ২০২৩ সালে বেসামরিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে। ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত মিয়ানমারের ক্ষেত্রে একই কৌশল গ্রহণ করা।…যার মাধ্যমে সামরিক শাসকদের সঙ্গে সীমিত পর্যায়ে যোগাযোগ শুরু করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে তার বদলে শুধু সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া। পাশাপাশি বিদ্রোহীদের প্রতি সামরিক সহায়তা কমানো প্রয়োজন; কারণ, এটি সহিংসতা দীর্ঘায়িত করছে। এর বদলে মানবিক সহায়তা বাড়ানো উচিত, যাতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত আসিয়ান এবং ভারত ও জাপানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে মিলে মিয়ানমারের সংকট সমাধানের জন্য কূটনৈতিকভাবে কাজ করা। এর মানে হলো, শুধু নিষেধাজ্ঞা বা চাপ প্রয়োগ না করে সব পক্ষকে আলোচনায় বসতে রাজি করানো। কারণ, মিয়ানমারে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি তখনই আসবে, যখন সেনাবাহিনীসহ সব দল আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাবে।
বাস্তববাদী নীতি গ্রহণ করলে ট্রাম্প প্রশাসন মিয়ানমারের মানবিক সংকট কমাতে পারবে, জান্তা ও বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংলাপের সুযোগ তৈরি করতে পারবে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দেশে চীনের প্রভাব মোকাবিলা করতে পারবে। “


