ক্যান্সারের বিরুদ্ধে জীবাণুর ব্যবহার , অবশেষে আলোর মুখ দেখার পথে

এমন একটা পৃথিবী চিন্তা করুন যেখানে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুকে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে !এবার এমনটাই ঘটছে এবং কিছু বিজ্ঞানী এভাবেই কাজ করছেন। তারা জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ারড জীবাণুর মাধ্যমে ক্যান্সার কোষগুলিকে লক্ষ্য করে তা ধ্বংস করার পদ্ধতি আবিষ্কার করতে শুরু করেছেন। ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে ক্যান্সার চিকিৎসার ইতিহাস ১৮৬০ এর দশকে প্রথম শুরু হয়। উইলিয়াম বি. কোলে নামক এক বিজ্ঞানী স্ট্রেপটোকোক্কাস নামক জীবাণু এক কিশোরী রোগীর শরীরে ইনজেক্ট করেন। এই কিশোরীটি অচিকিৎসাযোগ্য হাড়ের ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। আশ্চর্যজনকভাবে এই অপ্রথাগত পদ্ধতিটি ক্যান্সারের টিউমার সঙ্কুচিত হতে সাহায্য করেছিল, এটি ছিল ইমিউনোথেরাপির প্রথম উদাহরণ।

পরবর্তীতে নিউ ইয়র্কের মেমোরিয়াল হাসপাতালের বোন টিউমার সার্ভিসের প্রধান হিসেবে কোলে ১,০০০ এরও বেশি ক্যান্সার রোগীকে ব্যাকটেরিয়া বা ব্যাকটেরিয়ার উৎপাদিত টক্সিন ইনজেক্ট করেছিলেন। এই টক্সিনগুলো পরে ‘কোলি টক্সিন’ হিসেবে পরিচিতি পায়।প্রথম দিকে এটি আশাজনক সাফল্য দেখালেও পরবর্তী বছরগুলোতে ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে রেডিয়েশন থেরাপি এবং কেমোথেরাপির বিকাশ কোলে’র কাজকে ছাপিয়ে যায় এবং তার পদ্ধতি নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। তবে আধুনিক ইমিউনোলজি কোলে’র অনেক তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণ করেছে। সাথে দেখিয়েছে কিছু ক্যান্সার সত্যিই ইমিউন সিস্টেমের উন্নতির প্রতি খুবই সংবেদনশীল, যেগুলো আমরা আজকের দিনে রোগীদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করতে পারি। এবার ব্যাকটেরিয়া ভিত্তিক ক্যান্সার থেরাপি কীভাবে কাজ করে?

এই থেরাপিগুলি কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিশেষ ক্ষমতাকে কাজে লাগায়, যেমন-ক্যান্সারের টিউমারের ভেতরে বৃদ্ধি পাওয়ার ক্ষমতা।ক্যান্সারের চারপাশে থাকা অক্সিজেনের অভাব, অ্যাসিডিক পরিবেশ এবং মৃত টিস্যু-এই টিউমার মাইক্রোএনভায়রনমেন্ট ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি এবং বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। একবার টিউমারে প্রবেশ করার পর, ব্যাকটেরিয়া সরাসরি ক্যান্সার কোষগুলিকে ধ্বংস করতে পারে অথবা শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী করে তুলতে পারে। তবে এই পদ্ধতি গ্রহণের পথে বেশ কিছু বাধাও রয়েছে।

প্রথমত নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, কারণ জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করলে তা ক্ষতিকর হতে পারে। তাই গবেষকরা ব্যাকটেরিয়ার প্রজাতিকে অতি সতর্কতার সাথে দুর্বল করে নিশ্চিত করেছেন যাতে তা স্বাস্থ্যকর টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত না করে। এছাড়া ব্যাকটেরিয়ার আচরণ নিয়ন্ত্রণ এবং টিউমারে তাদের সঠিকভাবে পরিচালনা করা, এমনকি অন্যত্র ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মাইক্রোবায়োম নামে পরিচিত ব্যাকটেরিয়া অলরেডি আমাদের শরীরের অভ্যন্তরে থাকে। ফলে নতুন ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করালে এটি প্রাকৃতিক পরিবেশে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, যা আরেকটি চ্যালেঞ্জ। এছাড়া কিভাবে ব্যাকটেরিয়া ক্যান্সারের মাইক্রোএনভায়রনমেন্ট এবং ইমিউন সিস্টেমের সাথে এডজাস্ট করে সেসব আমরা এখনও সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারিনি।

এখনও অনেক বাধা থাকা সত্ত্বেও, সাইনটিফিক ক্ষেত্রগুলির উন্নয়ন, বিশেষত সিন্থেটিক বায়োলজি এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এই ক্ষেত্রটিকে নতুন জীবন দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন ব্যাকটেরিয়াকে আরও উন্নত ফাংশন প্রদান করতে সক্ষম। যেমন-স্পেসিফিক অ্যান্টি-ক্যান্সার এজেন্টগুলো টিউমারের মধ্যে সরাসরি উৎপাদন ও বিতরণ করা। এই লক্ষ্যভিত্তিক পদ্ধতি ক্যান্সার চিকিৎসার কিছু সীমাবদ্ধতা, যেমন সাইড-এফেক্ট এবং গভীর টিউমার টিস্যুতে পৌঁছানোর সমস্যা অতিক্রম করতে সাহায্য করতে পারে। একাধিক গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে ব্যাকটেরিয়া ভিত্তিক থেরাপি বিশেষ করে সলিড টিউমার, যেমন কলোন ক্যান্সার, ডিম্বাশয় ক্যান্সার এবং মেটাস্টেটিক ব্রেস্ট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী হতে পারে।

যেখানে আমরা সবচেয়ে ভাল প্রমাণ পেয়েছি তা হলো ব্যাকটেরিয়া ও নিয়মিত ব্যবহার করা ইমিউনোথেরাপি ওষুধের সাথে একত্রে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করতে পারে। সম্প্রতি কিছু গবেষক ই.কোলাই ব্যাকটেরিয়ার স্ট্রেন ব্যাবহার করে, যা ক্যান্সারের কোষগুলোকে চিনতে এবং আক্রমণ করতে সক্ষম ইমিউন সেলের কাছে ছোট টিউমার প্রোটিনের টুকরো সরবরাহ করেছে। এই পদ্ধতিটি পরীক্ষামূলক প্রাণীদের মধ্যে টিউমার সঙ্কুচিত করতে এবং কখনও কখনও সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। যতই চ্যালেঞ্জ থাকুক না কেন, ব্যাকটেরিয়া ভিত্তিক ক্যান্সার থেরাপির সম্ভাবনা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। আমাদের টিউমার বায়োলজি এবং ব্যাকটেরিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পর্কে বোঝাপড়া উন্নত হলে আমরা ক্যান্সার চিকিৎসার একটি নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পারি।

গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হলে, ব্যাকটেরিয়া ভিত্তিক এই থেরাপি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী নতুন অস্ত্র হিসেবে কাজ করতে পারে এবং এটি ইমিউনোথেরাপি ও কেমোথেরাপির মতো বিদ্যমান চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোর সাথে সমন্বয় করে আরও কার্যকরী হতে পারে।





LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন