মাহফুজ আলম এর বক্তব্যে জামাতের প্রতিবাদ প্রসঙ্গে : সহুল আহমেদ মুন্না , লেখক ও এক্টিভিস্ট

মাহফুজের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানানোর মাধ্যমে জামায়াত দল হিসেবে আবার নিশ্চিত করলো, একাত্তরে তাদের ভূমিকা নিয়ে তাদের মধ্যে এখনো ন্যূনতম কোনো অনুশোচনা তৈরি হয়নি। আওয়ামীলীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে রাজনীতি করেছে, ইনসাফের দাবিকে বেইনসাফির উপলক্ষ্য বানিয়েছে, সত্য। তাই বলে, জামায়াতের ভূমিকা বদলে যায়নি। একাত্তরের জামায়াতে ইসলামির মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রামের প্রতিটা পাতা সাক্ষ্য দিচ্ছে যুদ্ধাপরাধ ও জেনোসাইডের সহযোগী হিসেবে তৎকালীন জামায়াত নেতাদের সংশ্লিষ্টতা।

… গোলাম আজম জুন মাসের ২০ তারিখ লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি অনেক কথাই বলেন। …এই সংবাদ সম্মেলনের যে সংবাদ প্রকাশ করেছিল দৈনিক সংগ্রাম, সেখানে এও বলা হয়েছিল যে, গোলাম আজম বলছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ‘তিনি বলেন, তার দল পূর্ব পাকিস্তানের দুষ্কৃতিকারীদের তৎপরতা দমন করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে …’। এবং বরাবরের মত এইখানেও বলেন যে, ‘পাকিস্তান ও ইসলাম এ দুটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এবং কেবলমাত্র ইসলামী আদর্শই পাকিস্তানের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারে’।

… একদিকে যখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, সেটাকে গোলাম আজম বলে বেড়াচ্ছেন, এটা ছাড়া ‘উপায় ছিল না’, টিক্কাখানের সাথে বৈঠক করছেন, সামরিক বাহিনীর পক্ষে মিছিল করে যাচ্ছেন, এবং তার এই যে স্বীকারোক্তি, জামায়াত ‘দুষ্কৃতিকারীদের তৎপরতা দমন’ করতেছিল, এই কাজগুলোকে কী বলা যায়? পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যদি যুদ্ধাপরাধ করে তাহলে তো সেটা যুদ্ধাপরাধের সহযোগিতাই তো…? আহারে! জামাতের সেক্রেটারি সাহেব, খামোখা ভূগোল বুঝাইতে আইসেন না। আপনার পত্রিকাই সব সাক্ষ্য দিচ্ছে! শাহরিয়ার কবিররা আওয়ামীলীগের কাছে মগজ বিক্রি করেছেন, সত্য। তাই বলে একাত্তরে আপনাদের আসল ভূমিকা কেউ তুলে ধরলে তাকে ‘শাহরিয়ার কবির’ বইলা গালি দিয়ে লাভ নাই। গালি দিয়েও ইতিহাস পালটানো যাইবে না তো!

আপনি দল হিসাবে এইকালে জুলুমের শিকার হয়েছিলেন বলে আপনার অতীতের জুলুম জায়েজ হয়ে যায়নি। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর ওপর সর্বাধিক সহিংসতার সাথে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা ছিল। এটা ঐতিহাসিক সত্য। … জামায়াতে ইসলামি যে তরিকায় যুদ্ধাপরাধের সাথে তাদের ভূমিকাকে অস্বীকার করে ও পর্যলোচনা করতে অনীহা প্রকাশ করে, ঠিক একই তরিকায় আওয়ামীলীগ করবে। জামায়াতে ইসলামি নেতারা সম্প্রতি যখন একাত্তর নিয়ে কথা বলতে যান, তখন কয়েকটা প্রবণতা পরিষ্কার। প্রথমত, তারা তাদের ভূমিকাকে ‘ভারত-বিরোধীতা’র মোড়কে হাজির করে। তারা প্রথমেই বলেন যে, ভারত তাদের স্বার্থেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।

দুনিয়ার যে কোনো রাষ্ট্রই আরেক রাষ্ট্রের পক্ষে/বিপক্ষে দাঁড়াবে, সেটা তার স্বার্থেই। ভারতের ভূরাজনৈতিক্ স্বার্থ, উদ্ভূত শরণার্থী সঙ্কট থেকে শুরু করে বহু কারণেই যে ভারত মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল এইটা তো নতুন কোনো কথা নয়।বাংলাদেশ থেকে শুরু করে দুনিয়ার বিখ্যাত গবেষকগণ সেটা দেখিয়েছেন। বাংলাদশের বামপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরে এসব নিয়ে কথা বলেছেন।মুক্তিযুদ্ধে ভারত তার স্বার্থ দেখেছে, এইটা কীভাবে মুক্তিযুদ্ধ এই জনগোষ্ঠীর লড়াইয়ের ন্যায্যতা হারায় কিংবা এটা কীভাবে পাকিস্তান সামরিক সরকারকে জেনোসাইডমূলক সহিংসতায় জামায়াতের দলীয় সহযোগীতার ন্যায্যতা পায়, সেটা আল্লা মাবুদ জানেন।

এখন ধরেন, দুনিয়ার যে কোনো গণ-আন্দোলনে, বহিরাগত শক্তি জড়িত হয়, সুপার পাওয়ার জড়িত হয়। তারা তাদের স্বার্থে আন্দোলনের হিসাব নিকাশ করে। এটা তো আর খোদ আন্দোলনের ন্যায্যতার প্রশ্ন নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান যখন হচ্ছে, বহু রাষ্ট্র কী নানাভাবে এতে তাদের স্বার্থ দেখে নাই? বা দেখবে না? এখন মার্কিনিরা বা ভারত তাদের স্বার্থ দেখেছে বলে, আওয়ামীলীগের সহিংসতা বা জামায়াতের সহিংস ভূমিকা কী জায়েজ হয়ে যায়? দ্বিতীয় যে প্রবণতা জামায়াতের আমির ৫ আগস্টের পর বলার শুরু করছেন, তিনি একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকাকে চিন্তার দ্বন্দ্ব আকারে তুলে ধরছেন। এবং মোলায়েম সুরে বলছেন যে, তাদের ভিন্ন চিন্তা ছিল। সেই চিন্তা একাত্তরে পরাজিত হয়েছে, এরপর তারা বাংলাদেশকে মেনে নিয়েছেন মনেপ্রাণে।

ঠিক, চিন্তার দ্বন্দ্ব ছিল। এইখানে শুভঙ্করের ফাকি হচ্ছে, চিন্তার দ্বন্দ্ব বইলা তারা তো তাদের অপরাধকে আড়াল কইরা ফেলতে চান। জেনোসাইড ও যুদ্ধাপরাধের সহযোগীতা তো অপরাধ। এটাকে চিন্তার দ্বন্দ্ব দিয়া মোলায়েম বানায়ে লাভ নেই। আওয়ামীলীগ জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে রাজনীতি করেছে, তাই বলে জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা সহি হয়ে যায়নি। এইবার একটা উদাহরণ দেই।…এই যে জামায়াতে ইসলাম মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকাকে জাস্টিফাই করার জন্য বলে, ভারতের আধিপত্যের ভয়েই তারা তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পক্ষে বা অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, এই ন্যারেটিভকে একাই ধ্বসিয়ে দেন সিরাজ শিকদার।






LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন