‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?’ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা “কপালকুন্ডলা” উপন্যাসের পথ হারানো নবকুমারকে করা কপালকুণ্ডলার এই প্রশ্নটিকে বাংলা সাহিত্যের সর্ব প্রথম রোমান্টিক লাইন হিসেবে ধরা হয়! এই লাইনটি মনে এলে যেন স্বয়ং নিজেকেই প্রশ্ন করে বসতে ইচ্ছে করে, ‘পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ?’ এই ছোট বাক্যটির আকুতি- আহ্বান যেন যুগের পর যুগ ধরে একটুও ক্ষয় হয়নি। যতবার পুনরাবৃত্তি করা হয়, ততবারই যেন পথ চলার একই দ্বিধা নিয়ে ফিরে ফিরে আসে! ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত এই “কপালকুন্ডলা” বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তখনও তাঁর পূর্ণ বিকাশের শীর্ষে পৌঁছাননি, তবে এই উপন্যাসেই তিনি বাংলা উপন্যাসের মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেন। কাহিনিটি গড়ে উঠেছিলো এক রহস্যময়, প্রেমময় ও রোমাঞ্চকর আবহের মধ্যে।
উপন্যাসের নায়ক নবকুমার একদিন দুর্গম অরণ্যে পথ হারিয়ে ফেলেন। সেই অরণ্যে তার দেখা হয় এক অনিন্দ্যসুন্দরী নারীর সঙ্গে, যার নাম কপালকুন্ডলা। কপালকুন্ডলা এক তান্ত্রিকের আশ্রয়ে মানুষ হয়েছে, সভ্য সমাজের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। নবকুমার তাকে দেখে মোহিত হন, আর কপালকুন্ডলাও ধীরে ধীরে প্রেমের অনুভূতি উপলব্ধি করতে থাকে। কিন্তু এই প্রেম সহজ সরল পথে এগোয় না। এতে রয়েছে একই সাথে কুসংস্কার, সমাজ, বিশ্বাস ও আত্মপরিচয়ের জটিল টানাপোড়েন। কপালকুন্ডলা বাংলা সাহিত্যের এক বিস্ময়কর নারী চরিত্র। একাধারে সে মুক্তচিন্তার প্রতীক, অন্যদিকে তার সহজাত প্রেমবোধ তাকে এক অনন্য সৌন্দর্যে ভাস্বর করেছে। সভ্যতার কৃত্রিমতার বাইরে গড়ে ওঠা এই নারী যখন প্রেমের স্পর্শ পায়, তখন সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সে কি নবকুমারের সঙ্গে সভ্য সমাজে যাবে, নাকি তার আপন অরণ্যের জীবন বেছে নেবে? এই দ্বন্দ্ব তাকে করে তোলে অনন্য।
উপন্যাসের একটি বিখ্যাত দৃশ্যে দেখা যায়, কপালকুন্ডলা নবকুমারের মুখে শুনছে প্রেমের কথা। সে তখনও জানে না প্রেম কী, তবু এক অজানা অনুভূতি তার মনে সঞ্চারিত হয়। “কপালকুন্ডলা কহিল, ‘প্রেম কী?’ নবকুমার কহিল, ‘যাহাকে দেখিলে চিত্ত আনন্দিত হয়, তাহার নিকটে যাইতে ইচ্ছা করে, তাহার কথা শুনিতে ভাল লাগে, তাহাকে না দেখিলে চিত্ত ব্যাকুল হয়, সেই প্রেম।'” এই সংলাপ শুধু উপন্যাসের নয়, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এখানে প্রেমের এক সহজ অথচ গভীর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যা যুগের পর যুগ পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
কপালকুন্ডলার জীবন শুধু প্রেমের আবেগে নয়, এক গভীর ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে যায়। যে তান্ত্রিক তাকে লালন-পালন করেছে, সে তাকে নিজের কামনা চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করতে চায়। তান্ত্রিকের ষড়যন্ত্র ও কপালকুন্ডলার আত্মপরিচয়ের সংকট উপন্যাসটিকে আরও নাটকীয় ও গভীর করে তোলে। একটি দৃশ্যে দেখা যায়, তান্ত্রিক কপালকুন্ডলাকে বলে: ‘তুই আমার সৃষ্টি, আমি তোকে যা বলিবি, তাই করিতে হইবে।’ এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে কপালকুন্ডলার স্বাধীনতার সংকট। সে কি নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্ধারণ করতে পারবে, নাকি তাকে অন্য কারও ইচ্ছার অধীন হতে হবে?
উপন্যাসটি কেবল প্রেমের নয়, এটি সমাজের রীতি-নীতি, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়েরও গল্প। কপালকুন্ডলা এক দিক থেকে নবকুমারকে ভালোবাসে, কিন্তু সভ্য সমাজে যাওয়ার ধারণা তার কাছে ভীতিকর। অন্যদিকে নবকুমারও দ্বিধায় পড়ে সেকি কপালকুন্ডলাকে পরিবর্তিত করতে চায়, নাকি তার স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রাখতে চায়? এই দ্বন্দ্বের ফলে উপন্যাসের কাহিনি আরও গভীর ও হৃদয়গ্রাহী হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত, কপালকুন্ডলা নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেয়, যা বাংলা সাহিত্যে এক বিরল ঘটনা।
এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র এখানে প্রেমকাহিনি বলেননি, তুলে ধরেছেন সমাজ, সংস্কার, বাঁধা, অস্তিত্ব ও জীবনের সংকট। এই উপন্যাস পড়ার পর পাঠকের মনে দীর্ঘদিন যে প্রশ্ন থেকে যায় সেটা হলো পথিক! তুমি পথ হারাইয়াছ? হয়তো কপালকুন্ডলার মতো আমরাও সমাজের নানা নিয়ম, প্রেম ও আত্মপরিচয়ের টানাপোড়েনে পথ হারাই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদেরও নিজস্ব পথ নিজেদেরই খুঁজে নিতে হয়।


