১৯৭১ সালের ১৭ মার্চ রাত প্রায় ১০টায় পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল টিক্কা খান ফোন করলেন ১৪তম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজার কাছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছ থেকে তিনি চূড়ান্ত নির্দেশনা পেয়েছেন ।টিক্কা খান টেলিফোনে খাদিম হুসেন রাজাকে বললেন, ‘এখনই মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলিকে সঙ্গে নিয়ে আমার বাসায় চলে আসুন।’ রাও ফরমান আলি তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের উপদেষ্টা।
টিক্কা খানের এই নির্দেশ পাওয়ার পর ওই রাতেই রাও ফরমান আলি ও খাদিম হুসেন রাজা গেলেন টিক্কা খানের কমান্ড হাউসে। সেখানে আরও একজন জেনারেল ছিলেন, তিনি হলেন হামিদ খান। কালক্ষেপণ না করে জেনারেল টিক্কা খান তাদের দুজনের উদ্দেশে বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে শেখ মুজিবের আলোচনা খুব একটা এগোচ্ছে না। তাই প্রেসিডেন্ট এখন সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে।এ লক্ষ্যে আপনারা এখন আনুষঙ্গিক পরিকল্পনা তৈরি করুন।’ এই কয়েকটি বাক্য ছাড়া জেনারেল টিক্কা খান আর কিছুই বললেন না এবং কোনো লিখিত নির্দেশনাও দিলেন না। টিক্কা খান শুধু বললেন, ‘আপনারা দুজন মিলে পরিকল্পনা তৈরি করুন। আগামীকাল (১৮ মার্চ) এই পরিকল্পনা নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করবেন।’
টিক্কা খানের নির্দেশনা অনুযায়ী রাও ফরমান আলি ১৮ মার্চ সকালে খাদিম হুসেন রাজার অফিসে যান। এরপর তারা দুজন মিলে সামরিক অভিযানের ‘ব্লুপ্রিন্ট’ তৈরি করতে বসেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে খাদিম হুসেন রাজা ও রাও ফরমান আলি সামরিক অভিযানের রূপরেখার ব্যাপারে ঐকমত্য হন। তারপর যার যার অংশ লিখতে শুরু করেন। ঢাকার গ্যারিসনে কীভাবে অপারেশন চালাবে তা রাও ফরমান আলি দ্রুত লিখে ফেলেন। আর খাদিম হুসেন রাজা বাকি প্রদেশের সেনাদের কাজের বিন্যাস করেন। এরপর ওইদিন (১৮ মার্চ) রাতে তারা দুজন কমান্ড হাউসে গিয়ে টিক্কা খানের কাছে তাদের পরিকল্পনার ‘ব্লুপ্রিন্ট’ জমা দেন। তাদের এই ব্লুপ্রিন্ট টিক্কা খান বিনাবাক্যে গ্রহণ করেন। এই ব্লুপ্রিন্টের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’।
মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজা তার লেখা ‘অ্যা স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’ শীর্ষক বইয়ে সার্চলাইট অপারেশনের পরিকল্পনা বিষয়ে এমনটিই লিখেছেন। ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ শিরোনামে বইয়ে মেজর সিদ্দিক সালিক ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বিষয়ে বলেছেন তিনি স্বচক্ষে সেই হাতে লেখা পরিকল্পনার খসড়া দেখেছিলেন। তাতে সামরিক অভিযানের প্রাথমিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, শেখ মুজিবের ডিফ্যাক্টো শাসনকে উৎখাত করা এবং সরকারের (পাকিস্তানের) কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এই পরিকল্পনা ছিল ১৬টি প্যারাসংবলিত এবং পাঁচ পৃষ্ঠা দীর্ঘ। পরিকল্পনা অনুমোদিত হলেও কবে সামরিক অপারেশন চালানো হবে, সেই দিনক্ষণ নির্ধারিত ছিল না।
পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী আটটি স্থায়ী ও অস্থায়ী ক্যান্টনমেন্টে বিন্যস্ত ছিল-ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, রাজশাহী, রংপুর ও সৈয়দপুর। এর সঙ্গে ২ নম্বর ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অবস্থান ছিল ঢাকার কাছে, জয়দেবপুরে। ২৪ মার্চ দুটি হেলিকপ্টার নিয়ে রাও ফরমান আলি এবং খাদিম হোসেন রাজা ঢাকার বাইরে অবস্থানরত ব্রিগেড কমান্ডারদের সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশনা দিতে রওনা হন। তারা চেয়েছিলেন গোপনীয়তা বজায় রেখে বিভাগীয় কমান্ডারদের সরাসরি নির্দেশনা দেবেন এবং মাঠপর্যায়ে যদি কোনো সমস্যা থাকে সেটি কৌশলে সমাধান করবেন।
তারা যশোর, কুমিল্লা, চট্টগ্রামে যান। সিলেট, রংপুর এবং রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টে পাঠানো হয় সিনিয়র স্টাফ অফিসারদের। অভিযানের জন্য প্রস্তুত হতে বলা হলেও ব্রিগেড কমান্ডারদের জানানো হয়েছিল, আঘাত হানার সময় পরে জানানো হবে। সময় জানিয়ে মেজর জেনারেল খাদিম হুসেনের কাছে লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের কাছ থেকে ফোনটি এসেছিল ২৫ মার্চ বেলা ১১টায়। সংক্ষেপে বলা হয়েছিল, ‘খাদিম, আজ রাতেই’। সময় নির্দিষ্ট হয়েছিল রাত ১টা। হিসাব করা হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ততক্ষণে নিরাপদে করাচি পৌঁছে যাবেন। উল্লেখ্য, ওইদিন সন্ধ্যায় তিনি করাচির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেশের বিভিন্ন ব্যারাক ঘুরে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা তদারকি করলেও, অপারেশন সার্চলাইটে অংশ নেওয়ার জন্য সামরিক বাহিনীর কারও কাছেই কোনো লিখিত অর্ডার পাঠানো হয়নি।


