অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে উন্নয়নশীল ও উন্নত-এই দুই শ্রেণিতে সব দেশকে ভাগ করে থাকে জাতিসংঘ। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যে দেশগুলো তুলনামূলক দুর্বল, তাদের নিয়ে ১৯৭১ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা হয়।বর্তমানে বিশ্বে ৪৪টি স্বল্পোন্নত দেশ রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলো যাতে এগিয়ে যেতে পারে এবং নিজেদের উন্নতি করতে পারে, সে জন্য উন্নত দেশগুলো নানা ধরনের সুবিধা দেয়। জনসংখ্যা কম, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, ছোট দ্বীপপুঞ্জ, ভূবেষ্টিত দেশ-এসব বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে এলডিসিতে তালিকাভুক্ত করে জাতিসংঘ। কিন্তু বাংলাদেশ এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল না। জনসংখ্যার আধিক্যের বিচারে অর্থনৈতিক সক্ষমতা কম-এমন বিশেষ বিবেচনায় বাংলাদেশকে ১৯৭৫ সালে এলডিসি তালিকায় নিয়েছিল জাতিসংঘ।
এলডিসিভুক্ত দেশ হওয়ার কারণে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য-সুবিধাসহ নানা ছাড় পেয়েছে বাংলাদেশ। দেশের বর্তমান যে অগ্রগতি, তার মূল কারণ এই এলডিসিভুক্তি। পাঁচ দশক ধরে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকায় আছে বাংলাদেশ। নানা ধরনের যাচাই-বাছাই পেরিয়ে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখন এই সময়সীমা কিছুটা পিছিয়ে দিতে চায়। এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে একটি দেশের মানমর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ হয়। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারী আস্থা রাখতে পারেন। একটি দেশের সমৃদ্ধি বিবেচনা করা হয় দেশটি কোন্ শ্রেণিতে আছে, এর ওপর।
অন্যদিকে এলডিসি তালিকায় থাকলে ওই দেশকে নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয় উন্নত দেশগুলো। এটি অনেকটা পরনির্ভরশীলতায় থাকার মতো বিষয়। প্রতি তিন বছর পরপর এলডিসিগুলোর ত্রিবার্ষিক মূল্যায়ন করা হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা-এই তিন সূচক দিয়ে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কি না, সেই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মানদণ্ডের তিনটিতেই উত্তীর্ণ হয়। ২০২১ সালেই বাংলাদেশ চূড়ান্ত সুপারিশ পায় যে ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ হতে পারে বাংলাদেশ। করোনার কারণে প্রস্তুতির জন্য আরও দুই বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়। এখন বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় আরও পেছাতে চায়।
এলডিসি থেকে বের হলে সবচেয়ে সমস্যায় পড়তে হবে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে। কারণ, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্য-সুবিধা পায়। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপির আওতায় এই শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে ২০২৯ সাল পর্যন্ত। বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে ওষুধশিল্প। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোকে আবিষ্কারক প্রতিষ্ঠানকে মেধাস্বত্বের জন্য অর্থ দিতে দিতে হয় না। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে গেলে ওষুধশিল্পের এই সুবিধা থাকবে না।
এলডিসি হিসেবে যেকোনো দেশ তার দেশে উৎপাদিত পণ্য বা সেবার ওপর নগদ সহায়তা ও ভর্তুকি দিতে পারে। বাংলাদেশ এখন যে রপ্তানি আয় বা রেমিট্যান্স আনায় নগদ সহায়তা দেয়, তা নিয়ে আপত্তি উঠতে পারে। এলডিসি থেকে উত্তরণ হওয়া দেশগুলো আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সহজ শর্তের ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে। এলডিসি থেকে বের হলে প্রথমে যে লাভটি হবে, তা হলো বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। গরিব বা স্বল্পোন্নত দেশের তকমা থাকবে না। অর্থনৈতিক সক্ষমতার কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বেশি সুদে অনেক বেশি ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার মতো বিশ্বাসযোগ্য কোনো কারণ নেই। অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘যেকোনো শিক্ষিত মানুষ এলডিসি উত্তরণ চাইবে। আমরা আবেদন করে যোগ্য হইনি, আন্তর্জাতিক বিচারে প্রতিষ্ঠিত মাপকাঠিতে যোগ্য হয়েছি। শ্বেতপত্রেও বলা হয়েছে, তথ্যের বিকৃতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ মানদণ্ডের বিচারে ওপরে আছে।’ তিনি বলেন, ‘সময় পেছানো হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এমন ধারণা জন্মাবে যে আমরা আফগানিস্তানের মতো অযোগ্য দেশ। কারণ, তত দিনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপালও এলডিসি থেকে উত্তরণ হয়ে যাবে।’
এ পর্যন্ত গত পাঁচ দশকে সব মিলিয়ে আটটি দেশ এলডিসি থেকে বের হয়েছে। দেশগুলো হলো ভুটান, বতসোয়ানা, কেপ ভার্দে, ইকুইটোরিয়াল গিনি, মালদ্বীপ, সামোয়া, ভানুয়াতু, সাও টোমো অ্যান্ড প্রিন্সেপ। বর্তমানে বিশ্বে ৪৪টি স্বল্পোন্নত দেশ রয়েছে।দেশগুলো হলো-বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, অ্যাঙ্গোলা, বেনিন, বুরকিনা ফাসো, বুরুন্ডি, কম্বোডিয়া, সেন্ট্রাল আফ্রিকা, চাদ, কমরোস, কঙ্গো, জিবুতি, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, গাম্বিয়া, গিনি, গিনি বিসাউ, হাইতি, কিরিবাতি, লাওস, লেসেতে, লাইবেরিয়া, মাদাগাস্কার, মালাউই, মালি, মৌরিতানিয়া, মোজাম্বিক, মিয়ানমার, নেপাল, নাইজার, রুয়ান্ডা, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, তিমুর, টোগো, টুভালু, উগান্ডা, তানজানিয়া, ইয়েমেন ও জাম্বিয়া।


