পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে সামরিক বাহিনী অভিযান চালিয়ে পেশোয়ারগামী জাফর এক্সপ্রেস ট্রেনের ছিনতাই পর্বের সমাপ্তি টেনেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-এর ৩৩ জন সদস্য নিহত হয়েছেন।সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন ২৭ জন বেসামরিক নাগরিক ও একজন নিরাপত্তা সদস্যও। এই হামলা শুধু ভয়াবহতাই নয়, বরং এক বড় বার্তাও দিয়েছে – আরো সুসংগঠিত ও সাহসী হয়ে উঠছে বিএলএ। আয়তনের দিক থেকে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় কিন্তু জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে ছোট প্রদেশ। ১৯৪৮ সালে এটি পাকিস্তানের অংশ হয়। কিন্তু এরপর থেকেই সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে।
এই প্রদেশ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর-কয়লা, স্বর্ণ, তামা ও গ্যাসের বিপুল মজুদ রয়েছে এখানে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার সম্পদের সুবিধা নিলেও বেলুচ জনগণ অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে। এছাড়া, এই অঞ্চলে রয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোয়াদার বন্দর, যা ৬২ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্পের মূল অংশ। বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা মনে করেন, তাদের মাটিতে ব্যয়বহুল প্রকল্প হলেও সেখানে তাদের কোনো ভূমিকা নেই এবং স্থানীয়ভাবে কোনো কর্মসংস্থানও হয়নি এই প্রকল্পে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পর বেলুচিস্তানে মোট পাঁচটি বড় ধরনের বিদ্রোহ হয়েছে। সর্বশেষটি শুরু হয় ২০০০-এর দশকে। তখন বেলুচরা দাবি করে, তাদের সম্পদের বড় অংশ তাদের কল্যাণেই ব্যয় করতে হবে। পরে এই বিদ্রোহ ঝুঁকে পড়ে স্বাধীনতার দিকে। বিএলএ বরাবরই পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি করে আসছে। তারা কেবল স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেনি, বরং পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার লক্ষ্যেই চেষ্টা চালাচ্ছে। আদিবাসী নেতাদের বদলে বিএলএ এখন শিক্ষিত তরুণ নেতৃত্বে চলছে। বিএলএ-এর অর্থায়ন সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, চাঁদাবাজি, চোরাচালান, মাদক ব্যবসা এবং বিদেশী দাতাদের মাধ্যমে তারা অর্থ সংগ্রহ করে। পাকিস্তান সরকারের দাবি, ভারত বিএলএকে সহায়তা দেয়। তবে এ দাবি প্রমাণিত হয়নি।
অনেক গবেষক মনে করেন, আমেরিকার ফেলে যাওয়া অস্ত্র এখন বিএলএ-এর হাতে চলে গেছে। এছাড়া, আফগানিস্তান ও ইরানের ব্ল্যাক মার্কেট থেকেও তারা অস্ত্র সংগ্রহ করে। সরকারের বিরুদ্ধে বেলুচ জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধিতে বিএলএ উপকৃত হয়েছে।বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তানে বিদ্যমান গুম-নিখোঁজ ইস্যু, সরকারি অবহেলা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন বিএলএ-এর সমর্থন বাড়িয়েছে।ফলে এই সংগঠনে যোগ দিচ্ছে অনেক উচ্চশিক্ষিত বেলুচ যুবক।
বিএলএ ধীরে ধীরে তাদের কৌশল বদলাচ্ছে-ছোট আক্রমণ থেকে এখন বড় ধরনের অপারেশন পরিচালনা করছে। তাদের সাম্প্রতিক ট্রেন ছিনতাই, চীনা নাগরিকদের ওপর হামলা এবং আত্মঘাতী বোমা হামলা প্রমাণ করে যে, সংগঠনটি আরো সুসংগঠিত হচ্ছে। পাকিস্তানের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এই বিএলএ। দেশটির সরকার যদি বেলুচ জনগণের দাবিগুলো যথাযথভাবে মোকাবেলা না করে তবে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠতে পারে বিএলএ।


