২০১৭ সালের মে মাসে, একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল রাপা নুই দ্বীপে অভিযান পরিচালনা করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল দ্বীপের প্রাচীন মূর্তি এবং ইতিহাস নিয়ে নতুন করে গবেষণা করা। তারা দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি এবং পর্যবেক্ষণ চালিয়ে একটি চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেন।
গবেষকরা জানিয়েছিলেন, ৩৫টি মোয়াই মূর্তির নতুন অবস্থান চিহ্নিত করেছেন, যা পূর্বে জানানো হয়নি। তবে তাদের কাজটি শুধু পুরাতাত্ত্বিক নয়, সামাজিক এবং পরিবেশগত প্রশ্নগুলোকে পুনরায় উত্থাপন করে। কেন একসময় এত বিপুল সংখ্যক মূর্তি তৈরি করা হয়েছিল এবং কীভাবে, কেন বা কখন এগুলো ভেঙে পড়েছিল?
এই বাস্তব ঘটনা রাপা নুইয়ের ইতিহাসের জটিলতার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। প্রায় ৯০০টি মোয়াই মূর্তি-যেগুলো পাথরের বিশাল মাথা এবং কখনও কখনও দেহ নিয়ে সাজানো-এগুলো এক সময় দ্বীপবাসীর ক্ষমতা, আধ্যাত্মিকতা এবং সামাজিক শ্রেণির প্রতীক ছিল। ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা ১৮শ শতকে প্রথম রাপা নুই দ্বীপে এসে যখন এগুলো দেখতে পায়, তখন তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখে। কেন এসব মূর্তি ভেঙে পড়ল, তা নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব তৈরি হয়েছে, এবং আজও এটি বিশ্বব্যাপী আলোচিত একটি বিষয়।
রাপা নুই দ্বীপের ইতিহাস নিয়ে একটি অন্যতম জনপ্রিয় তত্ত্ব হাজির করেছেন জ্যারেড ডায়মন্ড তার বই Collapse (২০০৫)-এ। তিনি দাবি করেন, একসময় রাপা নুই ছিল একটি সবুজ বনানীপূর্ণ দ্বীপ, যেখানে পলিনেশিয়ানরা একটি শক্তিশালী সমাজ গড়ে তুলেছিল। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিকাজের অতিরিক্ত চাহিদা, এবং অপ্রত্যাশিতভাবে বন উজাড়ের ফলে দ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস হয়ে যায়।মোয়াই মূর্তির নির্মাণ ও পরিবহন প্রক্রিয়া গাছের কাঠের ওপর নির্ভরশীল ছিল, এবং গাছের অভাবে এ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এক পর্যায়ে মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যার ফলে দ্বীপের জনসংখ্যা প্রায় ১৫,০০০ থেকে কমে যায় ৩,০০০-এ।
ডায়মন্ডের এই ‘ধ্বংস’ তত্ত্ব দীর্ঘকাল ধরে জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু বিগত এক দশক ধরে কার্ল লিপো এবং টেরি হান্টসহ অন্য কিছু গবেষক একে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তারা দাবি করেন, রাপা নুইয়ের ধ্বংসের যে গল্প ডায়মন্ড বলেন তা আসলে ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের মিথ্যাচারের ফল। তাদের মতে, দ্বীপে কখনোই অতিরিক্ত জনসংখ্যা ছিল না বরং জনসংখ্যা সব সময়ই ৩,০০০-এর আশেপাশে ছিল। তারা আরো বলেন, মোয়াই পরিবহন প্রক্রিয়া গাছের কাঠের উপর নির্ভরশীল ছিল না, এগুলো ‘হাঁটিয়ে’ বা দড়ি দিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া হতো। এর প্রমাণ হিসেবে তারা The Statues That Walked (২০১১) বইতে একটি নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, যেখানে বলা হয় মোয়াইগুলোকে দুই পাশে দোল খাইয়ে নিয়ে যাওয়া হতো ।
তবে এই তত্ত্বও বেশ বিতর্কিত। রাপা নুইয়ে মানবিক পরিবেশগত ধ্বংসের একটি প্রতীক হিসেবে, ডায়মন্ডের তত্ত্ব এখনও অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য। তার ধারণা যে, পরিবেশের উপর মানুষের অত্যধিক চাপ এবং কাঠের নিঃশেষে সংঘাত ও সামাজিক অবনতি ঘটেছিল-এটা অনেক দৃষ্টিকোণ থেকেই সমর্থন পেয়েছে। তবে লিপো ও হান্টের ধারণা যতটা আকর্ষণীয়, ততটাই নিশ্চিত নয়। তাদের গবেষণায় তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন দিক উন্মোচন করেছেন, তা হলো রাপা নুইয়ে ইঁদুরের উপস্থিতি, যারা গাছের বীজ খেয়ে ফেলত এবং নতুন গাছ জন্মাতে দিত না, এটি পরিবেশগত বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হতে পারে।
সম্প্রতি, ২০২৪ সালে, লিপো ও হান্ট এক নতুন গবেষণায় জানিয়েছেন, রাপা নুই দ্বীপে পাওয়া ওবসিডিয়ান তৈরি mata’a নামে একটি সরঞ্জাম, পূর্বে যেটিকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে মনে করা হতো, তা আসলে কৃষিকাজ এবং আচার-অনুষ্ঠানিক কাজের জন্য ব্যবহৃত হত।এটি তাদের ধারাবাহিকতা তত্ত্বকে আরও শক্তিশালী করে, যেখানে বলা হয়েছে যে রাপা নুইয়ের মানুষের মধ্যে কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষ ছিল না, সমাজটি একপ্রকার স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছিল, পরবর্তীতে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের আগমনের পর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই গবেষণা মিডিয়া এবং জনসাধারণের কাছে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হতে পারে। সংবাদমাধ্যমগুলো শিরোনামে বলেছে: “ইস্টার দ্বীপে সংঘর্ষের ফলে ধ্বংস হয়নি,” এটি সঠিক নয়। লিপো এবং হান্ট নিজেদের গবেষণায় বলেছেন: “এটা বলার নয় যে দ্বীপে কোনো সহিংসতা বা সংগ্রাম ছিল না, যেখানে mata’a যুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার প্রমাণ দেয় না।”
তাহলে কী আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত? বর্তমানে, অধিকাংশ গবেষক এবং ইতিহাসবিদ মনে করেন যে, রাপা নুই দ্বীপে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর মানুষ সামাজিক এবং পরিবেশগতভাবে এক ধরনের ধ্বংসের সম্মুখীন হয়েছিল। তবে লিপো ও হান্টের তত্ত্বকে সমর্থন করেও আমরা এ বিষয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। একক কোনো গবেষণা বা বিশ্লেষণ কোনো প্রাচীন সমাজের ইতিহাসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে না।
আজও রাপা নুইয়ের সেই মোয়াই মূর্তিগুলো প্রমাণ করছে ইতিহাস কখনো সরল এবং একরৈখিক হয় না। একে বোঝাতে চাইলে আমাদের সেই ইতিহাসের পেছনে লুকানো নানা দৃষ্টিভঙ্গি ও গবেষণার বিবেচনায় নতুন করে প্রশ্ন করতে হবে। ইতিহাসের সত্য এত সহজে ধরা দেয় না, আর প্রকৃত ইতিহাস জানার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হয়।


