সংস্কার বিষয়ক পাঁচটি কমিশনের ১৬৬টি সুপারিশ বিষয়ে মতামত জানাতে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ‘স্প্রেডশিট’ পাঠায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ঐকমত্য কমিশন। সংবিধান সংস্কারের ৭০টি সুপারিশের মধ্যে ১১টিতে একমত ও ৩টিতে নীতিগতভাবে ঐকমত্য প্রকাশ করেছে তারা। ৬টি সুপারিশের সঙ্গে আংশিক একমত হয়েছে দলটি। বিএনপি যে ২০ প্রস্তাবের সঙ্গে আংশিক বা পুরো একমত, সেগুলো তারা আগামী সংসদে বাস্তবায়ন চায়।
- প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমাতে ‘জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল’ (এনসিসি) গঠনের সুপারিশ করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন।এতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা, উচ্চ ও নিম্নকক্ষের স্পিকার, বিরোধী দল থেকে উচ্চ ও নিম্নকক্ষে নির্বাচিত ডেপুটি স্পিকার, প্রধান বিচারপতি এবং তৃতীয় একটি (সরকারি ও বিরোধী নেতার বাইরে) দল থেকে একজন সংসদ সদস্য থাকবেন।সুপারিশ অনুযায়ী, এনসিসির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানদের নিয়োগ করা হবে। বিএনপি এসব সুপারিশের সঙ্গে একমত নয়। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দিতে হবে। বিএনপি মনে করে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছ নিয়োগের জন্য আইন করা যেতে পারে। আইনে বলা থাকবে, কীভাবে নিয়োগ হবে। সব বিষয় সংবিধানে থাকার প্রয়োজন নেই। এনসিসি গঠনে নারাজি জানিয়ে বিএনপি বলেছে, সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এরূপ কাউন্সিলের কার্যকারিতা যথেষ্ট প্রমাণিত নয়। বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় যে কোনো অপ্রমাণিত পদ্ধতির পরীক্ষা হিতে বিপরীত হতে পারে। বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেন, অনির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত এনসিসি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, এমনকি দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। সাংবিধানিক নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এতে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে না। এনসিসি-র সিদ্ধান্তক্রমে রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারবেন-এ সুপারিশে একমত নয় বিএনপি। দলটি মতামতে বলেছে, জরুরি অবস্থা জারির ক্ষমতা সরকার ও সংসদের বাইরে থাকা সংগত নয়।
- সংবিধান সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছে-কেউ জীবনে দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। বিএনপি এ সুপারিশের সঙ্গে একমত হয়নি। দলটি মতামত দিয়েছে, কেউ টানা তিনবার প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না। তবে বিরতি দিয়ে আবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন।
- রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদের মেয়াদ ৪ বছর নির্ধারণের সুপারিশেও একমত হয়নি বিএনপি। সরকারের মেয়াদ ৫ বছর বহাল রাখতে চায় তারা।
- কমিশনের সুপারিশ ছিল, যিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবেন, তিনি দলীয় প্রধান কিংবা সংসদ নেতার পদে থাকতে পারবেন না। এ দুই সুপারিশেও একমত নয় দলটি। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সংসদ নেতা এবং দলীয় প্রধান কে হবেন-তা দলের নিজস্ব বিষয়; সংবিধানের বিষয় নয়।
- ৭০ অনুচ্ছেদ শিথিল প্রশ্নে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ ছিল, অর্থবিল ব্যতীত নিম্নকক্ষের সদস্যরা স্বেচ্ছায় ভোট দিতে পারবেন। বিএনপি এতে দ্বিমত জানিয়ে প্রস্তাব করেছে — আস্থা ভোেট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধনী বিল ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রশ্ন জড়িত নয় এমন বিল ছাড়া সব বিষয়ে দলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারবেন সদস্যরা।
- কমিশন সুপারিশ করেছে, শুধু সংসদ নয়; ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’-এ নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রপতি। প্রস্তাবিত ৬৪ ‘জেলা সমন্বয় কাউন্সিল’ এবং ১২ ‘সিটি করপোরেশন সমন্বয় কাউন্সিল’-এর একটি করে ভোট থাকবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থেকে বিনা বাধায় দলীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঠেকাতে এ সুপারিশ করা হয়েছে। এসব সুপারিশ সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মতামতে জানিয়েছে বিএনপি। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ চালুর মতো সময় এখনও হয়নি। ২০২৩ সালে রাষ্ট্র সংস্কারে ঘোষিত বিএনপির ৩১ দফায় রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলা হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেছেন, রাষ্ট্রপতিকে কী কী ক্ষমতা দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করে সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের পর একটি উপ-অনুচ্ছেদ যোগ করা যেতে পারে। যেসব ক্ষমতা দেওয়া হবে, তা রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই করতে পারবেন।
- সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রস্তাব করেছিল-নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থনে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। বিএনপি এতে একমত হয়নি। বিএনপি মতামতে বলেছে, সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।
- সংবিধানের মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ বাদ দিয়ে বহুত্ববাদ, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে কমিশন। বিএনপি এতে একমত হয়নি দলটি সংবিধানের মূলনীতি ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে বলেছে। জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে মূলনীতিতে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস’ এবং ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ যুক্ত করেছিলেন।
- সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং ৯০ দিনের জন্য প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের সুপারিশে একমত বিএনপি। তবে তা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এনসিসির মাধ্যমে নয়। বিএনপি বলেছে, এতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে। বিলুপ্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী, উচ্চ আদালতের রায় অনুসারে প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচকালীন সরকারের প্রস্তাব করেছে দলটি। তবে তা করতে হবে আগামী সংসদে আলোচনার মাধ্যমে।
- দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের সুপারিশে নীতিগতভাবে একমত বিএনপি। সংস্কার কমিশন প্রস্তাব করেছে, উচ্চকক্ষের ১০০ সদস্য নির্বাচিত হবেন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে। বিএনপি এতে একমত নয়। দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে যেভাবে নারী আসন বণ্টন হয়, সেভাবে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন চায় তারা। বিএনপির প্রস্তাব অনুযায়ী, নিম্নকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপট ঠেকানোর জন্য কী ব্যবস্থা থাকবে -এমন প্রশ্নে সালাহউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেছেন, আনুপাতিক পদ্ধতি দুই কক্ষের বিরোধ সৃষ্টি করবে। এ কারণে অনেক দেশ উচ্চকক্ষ বিলোপ করছে। অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি নির্বাচন ব্যবস্থার কারণে সংসদে আসতে পারেন না। তাদের আনতে বিএনপি উচ্চকক্ষ চায়।
- সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছে-নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন থাকলেও সংবিধান সংশোধনে গণভোট লাগবে। বিএনপি বলছে, সংবিধানের সব সংশোধনীর জন্য গণভোেট বাস্তবসম্মত নয়।
- জরুরি অবস্থার সময় নাগরিকদের অধিকার রদ বা স্থগিত না করার সুপারিশেও একমত নয় বিএনপি। দলটির মতে, নাগরিকদের কোনো অধিকার রদ বা স্থগিত না করে জরুরি অবস্থা জারির কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে-বোধগম্য নয়।


