প্রায় দশ হাজার বছর আগের একটি গল্প বলা যাক! দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার লাল বালির মরুভূমিতে এক বৃদ্ধ নৃগোষ্ঠীর নেতা ওয়ারাম্বা তার নাতির সামনে বসে একটি বৃত্ত আঁকছিলেন। নাতির নাম ছিল হয়তো জিন্দা, অবাক হয়ে তার দাদার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “দাদা, এই চিহ্নগুলো তুমি কেন আঁকছো?” ওয়ারাম্বা ধীরে হাসলেন, তারপর আঙুল দিয়ে বালির ওপর আঁকা রেখাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “এই চিহ্নগুলো আমাদের পূর্বপুরুষদের গল্প বলে, বালির নিচে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন আত্মাদের কথা জানায়। যখনই আমরা মরুভূমির পথে হাঁটি, এই চিহ্নগুলো আমাদের সাথে সাহত চলে ও পথ দেখায়। এটিই পবিত্র আত্মাদের শক্তি।”
জিন্দা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে হয়তো তখনও বুঝতে পারেনি তার দাদা যে শিল্পকর্ম তৈরি করছিলেন তা কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, এটি একটি ইতিহাস, একটি ধর্ম, এবং একটি মানচিত্র। এই চিত্রগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে তৎকালীন ওশেনিয়া আদিবাসী তথা অস্ট্রেলিয়ানদের হাজার বছরের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের চিহ্ন। এই শিল্পের শিকড় অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী মানুষের প্রাচীন ধর্ম ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসে নিহিত। তারা বিশ্বাস করেন পৃথিবী ও এর সব সত্তা-মানুষ, প্রাণী, গাছপালা, নদী, পাহাড় সবই সৃষ্টি হয়েছিল “ড্রিমটাইম” বা “দ্য ড্রিমিং” নামক এক অদ্বিতীয় সময়ে। তারা মনে করেন তাদের পূর্বপুরুষেরা তখনই পাহাড়, নদী, বন্যপ্রাণী, এবং এমনকি আকাশও গড়ে তুলেছিলেন এবং আধ্যাত্মিকভাবে পৃথিবীর উপর শাসন করতেন। এই পূর্বপুরুষরা ছিলেন ঈশ্বরতুল্য শক্তির অধিকারী এবং তাদের কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করাই ড্রিমটাইম আর্টের মূল উদ্দেশ্য।
এই বিশ্বাস অনুযায়ী আদিবাসীদের প্রত্যেকটি গোত্রের নিজস্ব সৃষ্টি করা গল্প আছে, যেখানে বলা হয় কিভাবে অসহায় মানুষদের জন্য ভূমি, গাছপালা, প্রাণী ও জলাশয় তৈরি হয়েছে। আর এই ভিন্ন ভিন্ন কাহিনীগুলোই তারা তাদের চিত্রশিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরে যুগ যুগ ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে। এই অস্ট্রেলিয় আদিবাসীদের চিত্রশিল্পের ইতিহাস প্রায় ৫০,০০০ বছর পুরনো। প্রাগৈতিহাসিক যুগে তারা গুহার দেওয়ালে, বালির ওপর এবং কাঠের টুকরোয় চিত্র আঁকতেন। শিল্পের মাধ্যমে তারা তাদের দৈনন্দিন জীবন, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং সামাজিক মূল্যবোধ সংরক্ষণ করতেন।
ড্রিমটাইম আর্টটির আদি উৎস হলো গুহাচিত্র থেকে যেখানে হাজার হাজার বছর আগে আদিবাসী জনগণ তাদের শিকার এবং ধর্মীয় গল্পের প্রতীক হিসেবে আঁকতেন ও লিপিবদ্ধ করতেন। চিত্রগুলো ছিল তাদের বসবাসের স্থান এবং চিত্রায়িত কাহিনীগুলো ছিল একেকটি সৃজনশীল ইতিহাস, যেগুলো সময়ের সাথে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। প্রাচীন গুহাচিত্র ড্রিমটাইম আর্টের প্রাথমিক ধাপ হলেও আধুনিক যুগে এই শিল্পের অনেক বৈচিত্র্য এসেছে। ড্রিমটাইম আর্টের উত্থান ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা, যেটি বর্তমানে বহু অংশের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে: যেমন রক আর্ট, ডট পেইন্টিং, এক্স-রে আর্ট ইত্যাদি। তবে এগুলোর সবই এক সাধারণ উৎস থেকে এসেছে, সেটি হলো ড্রিমটাইমের বিশ্বাস ও তার সাথে জড়িত আধ্যাত্মিক সত্তা।
ডট পেইন্টিং ড্রিমটাইম আর্টের সবচেয়ে বিখ্যাত ধরন, যেখানে অসংখ্য ছোট ছোট বিন্দু দিয়ে চিত্র তৈরি করা হয়। এটি মরুভূমির বালির গঠনকে প্রতিফলিত করে এবং আত্মিক বার্তা লুকানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এক্স-রে আর্ট শিল্পে প্রাণীদের এমনভাবে আঁকা হয় যাতে তাদের হাড় ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও দেখা যায়। এটির মাধ্যমে বোঝা যায় আদিবাসীরা কিভাবে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের গভীর পর্যবেক্ষণ করতেন। রক আর্ট হচ্ছে তাদের প্রাচীনতম লিখনশৈলী। এই ধাঁচের উলুরু (Uluru) ও কাকাডু ন্যাশনাল পার্কের গুহাচিত্রগুলোর মধ্যে অনেকগুলোর বয়স প্রায় ২০,০০০ বছর। ড্রিমটাইম চিত্রকর্মে সাধারণত বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহৃত হয়।
বৃত্ত হচ্ছে শিবির, আগুন, বা জলাধারের প্রতীক। ঢেউ দ্বারা নদী বা আধ্যাত্মিক পথ বোঝায়। মানুষের পায়ের ছাপ হলো যাত্রা বা ভ্রমণের চিহ্ন। উঁচু পাহাড় ও রেখা মরুভূমির পর্বতমালা বা আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক। আদিবাসীদের এই চিত্রশিল্প একসময়ে কেবলমাত্র তাদের নিজস্ব সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রচলিত থাকলেও বর্তমানে এটি বিশ্বব্যাপী শিল্পপ্রেমীদের আকর্ষণ করছে। ১৯৭০-এর দশকে শিল্পী জিওফ বার্ডার প্রথমবারের মতো এই চিত্রশিল্পকে বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসেন। এরপর থেকে অনেক আদিবাসী শিল্পী তাদের সংস্কৃতির এই মহামূল্যবান ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরছেন। বর্তমানে ড্রিমটাইম আর্টের জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছে যে এটি আন্তর্জাতিক গ্যালারি ও মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হচ্ছে। এমনকি ফ্যাশন ডিজাইন, টেক্সটাইল এবং আধুনিক পেইন্টিংয়েও এই শৈলী ব্যবহৃত হচ্ছে।
ড্রিমটাইম আর্ট কেবলমাত্র চিত্রশিল্প নয়, এটি আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের আত্মপরিচয়, ধর্ম ও ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।একাধারে তাদের জীবনযাত্রার মানচিত্র, আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের অনন্য প্রতিফলন এবং চিরন্তন ঐতিহ্যের গল্প বলার মাধ্যম।আমাদের গল্পের জিন্দার মতো হয়তো অনেক আদিবাসী শিশু আজও অবসরে পূর্বপুরুষদের গল্প শুনে, বালির ওপর চিত্র আঁকে এবং শিখতে চেষ্টা করে কিভাবে এই রহস্যময় শিল্প তাদের অতীতের সাথে সংযুক্ত করে রেখেছিলো!


