গ্যাঞ্জফেল্ড এক্সপেরিমেন্ট হলো একটি প্যারাসাইকোলজিক্যাল পরীক্ষা যা টেলিপ্যাথি বা মনসংযোগের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান পরীক্ষা করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। এই এক্সপেরিমেন্টটির উদ্দেশ্য ছিলো মানুষের মানসিক শক্তির উপস্থিতি প্রমাণ করা, বিশেষ করে টেলিপ্যাথি। গ্যাঞ্জফেল্ড এক্সপেরিমেন্ট এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনা এবং বিতর্কের বিষয় হয়ে রয়েছে এবং এর ফলাফল অনেকটাই অস্পষ্ট ও মিশ্র। গ্যাঞ্জফেল্ড শব্দটি এসেছে জার্মান শব্দ ‘Ganz’ (পূর্ণ) এবং ‘Feld’ (মাঠ) থেকে, এটি একত্র করলে একটি পরিপূর্ণ বা পূর্ণ ক্ষেত্রের ধারণা প্রকাশ করে।
১৯৩০ সালের শেষদিকে এই এক্সপেরিমেন্টের প্রথম প্রস্তাবনা আসে। তবে আধুনিক গ্যাঞ্জফেল্ড এক্সপেরিমেন্ট প্রথমভাবে পরিচালনা করা হয় ১৯৭০-এর দশকে। তারা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন যে, মানুষ অপর একজনের চিন্তা বা অনুভূতি অন্যভাবে গ্রহণ করতে পারে কিনা, অর্থাৎ টেলিপ্যাথি আসলেই সম্ভব কিনা। গ্যাঞ্জফেল্ড এক্সপেরিমেন্টে দুইজন ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন একজন প্রেরক এবং একজন গ্রাহক। প্রেরককে একটি নির্দিষ্ট চিত্র, ভিডিও বা ছবি দেখানো হয়, যেটি গ্রাহক থেকে সরিয়ে রাখা থাকে।গ্রাহককে একটি পরিবেশে বসানো হয় যেখানে তার পাঁচটি ইন্দ্রিয় বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়। যেমন চোখে রেডিও ফ্লেইম বা সাদা আলো ব্যবহার করে এবং কান বন্ধ করে। এই অবস্থায় গ্রাহককে অস্থায়ীভাবে অনুভূতিহীন করে রাখা হয়, যাতে তার মস্তিষ্ক অন্য কোনো ধরনের তথ্য গ্রহণ না করতে পারে।
এখন প্রেরক তার ভাবনা, অনুভূতি বা যে ছবিটি সে দেখছে তা ‘প্রেরণ’ করার চেষ্টা করে। গ্রাহক, যিনি একেবারে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছেন তার অনুভূতিগুলো বা চিন্তা-ভাবনা যা তিনি প্রেরকের থেকে পাচ্ছেন, সেই তথ্যটি তাকে মনোযোগ দিয়ে প্রকাশ করতে হয়।পরবর্তীতে গ্রাহককে কিছু ছবি বা ভিডিও দেখানো হয়, যার মধ্যে প্রেরকের চিত্রের সাথে মিল আছে কি না তা খুঁজে বের করতে বলা হয়।পরীক্ষা পদ্ধতিটি মূলত এভাবেই শেষ হয়।
এই গ্যাঞ্জফেল্ড এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল যথেষ্ট বিতর্কিত। অনেক পরীক্ষায় দেখা গেছে, গ্রাহকরা প্রেরকের ভাবনা সঠিকভাবে অনুমান করতে পেরেছেন এবং তাদের সঠিকতা প্রায় একচেটিয়া অনুকূল ছিল, যেটি সাধারণ মেধার ধারণা অনুযায়ী অসম্ভব মনে হয়। কিন্তু অন্যান্য গবেষকরা এই পরীক্ষাগুলিকে যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে দাবি করেছেন। তাদের মতে পরীক্ষার পরিবেশ বা পরীক্ষা করার পদ্ধতিতে কিছু সমস্যা থাকতে পারে, যেগুলো এই ফলাফলগুলির অপব্যাখ্যা করতে পারে।
একটি গবেষণায় গ্রাহকদের সঠিকতার হার গড়ে ২৫-৩০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, যেটি সাধারণভাবেই ২৫ শতাংশ হওয়া উচিত এটা সন্দেহজনক। অন্য গবেষণায় কিছু ক্ষেত্রেও গ্রাহকের সঠিকতা শতকরা ৪০-৪৫% পর্যন্ত পৌঁছেছিল, যেটি হয়তো মানসিক শক্তির প্রমাণ হিসেবে দেখা হতে পারে। পরীক্ষায় কিছু নতুন প্রযুক্তিও ব্যবহৃত হয়েছে যেগুলো পরীক্ষার ফলাফল আরও নির্ভুল করার চেষ্টা করেছিল। যেমন পরীক্ষার সময় আলো এবং শব্দের বিশেষভাবে নির্ধারিত ব্যবস্থা ছিলো, যাতে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি অন্য কোনো ধরণের বাধা বা মনোযোগের প্রবণতা থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন ভিডিও ক্যামেরা এবং বিশেষ ধরনের সফটওয়্যারও ব্যবহার করা হয়েছে যতটা সম্ভব পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করার জন্য।
গ্যাঞ্জফেল্ড এক্সপেরিমেন্টের ফলাফল যথেষ্ট উদ্দীপক হলেও বৈজ্ঞানিক সমাজে অনেক সমালোচনা জাগিয়েছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন পরীক্ষার ফলাফলগুলি আরো অনেক বৈজ্ঞানিক বা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। একাধিক গবেষক জানিয়েছেন, এই পরীক্ষার ফলাফল ভুল বা অস্পষ্ট হতে পারে কারণ পরীক্ষার সময় কিছু মানসিক বিভ্রান্তি একেবারে ফেলে দেবার মতো বিষয়ও না। অন্যদিকে প্যারাসাইকোলজির গবেষকরা বিশ্বাস করেন, এই ধরনের পরীক্ষাগুলি মানব মনের শক্তির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে সাহায্য করতে পারে এবং টেলিপ্যাথির অস্তিত্বে বৈজ্ঞানিক প্রমাণও পাওয়া যেতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক মূলধারার গবেষকরা এই ফলাফলগুলিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৈধভাবে মেনে নেননি।
সব মিলিয়ে গ্যাঞ্জফেল্ড এক্সপেরিমেন্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিতর্কিত পরীক্ষা, যা মানুষের মানসিক ক্ষমতা এবং টেলিপ্যাথির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন ধারণা সৃষ্টি করেছে। এখনও এর ফলাফল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটি মানব মন এবং তার অজানা শক্তির প্রতি আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে যদি আরও উন্নত প্রযুক্তি এবং সুসংগঠিত সিস্টেমের মাধ্যমে এই ধরনের পরীক্ষা করা হয়, তবে হয়তো অসীম মনস্তাত্ত্বিক ক্ষমতা সম্পর্কে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যাবে।


