” … সম্প্রতি সবাইকে বিস্মিত করে স্বজাতির গেরিলাদের প্রতি প্রতিরোধযুদ্ধ থামিয়ে বাহিনী ভেঙে দিতে বলেছেন (তুরস্কের কুর্দি গেরিলা নেতা আব্দুল্লাহ ওজালান) । ওজালান কেন এটা বললেন? তুরস্ক ও আশপাশের অঞ্চলে এর ফলাফল কী হতে পারে, সে বিষয়ে ভাবাচ্ছে দুনিয়ার অনেককে। … ওজালানের আহ্বানের পরই ‘পিকেকে’ নামে পরিচিত কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি দ্রুত অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দিয়েছে।…শুরুতেই তারা ওজালানের মুক্তি চেয়েছে। ইঙ্গিত দিয়েছে, ওজালান ফিরে এলেই কেবল তাঁর মতামত শুনে তারা অস্ত্র ছাড়তে পারে। অনেকেরই কৌতূহল, পিকেকে কিসের বিনিময়ে বা কোন চাপে প্রতিরোধযুদ্ধ থামাচ্ছে? তাদের দলের ভেতর সব সংগঠক এ রকম উদ্যোগে সম্মত হবে কি না?
প্রায় দেড় কোটি কুর্দি আছে তুরস্কে। পুরো জনসংখ্যার ১৫ থেকে ২০ ভাগ হবে। তুর্কিদের সামরিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে কুর্দিদের গেরিলাযুদ্ধের বয়স ৪১ বছর হলো। উভয় পক্ষে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ মারা গেছেন দীর্ঘ এই সংঘাতে। কুর্দিদের হাতে অস্ত্র নেওয়ার পেছনে আদি লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা। এখন তারা চাইছে মূলত সিরিয়া-ইরাকসহ আশপাশের কুর্দি অঞ্চল নিয়ে বৃহত্তর এক স্বশাসিত এলাকা, যেখানে তারা নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে স্বস্তিতে থাকতে পারবে। বিশেষ করে তুরস্কের সংবিধানে সেই ধারা নিয়ে (অনুচ্ছেদ ৬৬) বিতর্ক বেশ চলমান, যেখানে নাগরিকত্বের শর্ত হিসেবে তুর্কি হওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। এতে কুর্দিদের জাতীয়তা সাংবিধানিকভাবে অনেকখানে অস্বীকৃত। তারা মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারও চায়।
অস্ত্রবিরতির ঘোষণার আগে এসব বিষয়ে বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা যায়নি। কুর্দি ভাষা ও কুর্দিদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক চর্চার চেষ্টা ১৯৮০ সাল থেকে ব্যাপক নিপীড়নের শিকার হয়েছে তুরস্কে। তুর্কি জাতিবাদীদের একাংশ বরাবরই বলে, কুর্দিরা হলো ‘পাহাড়ি তুর্কি’ মাত্র। এসব অতীত অভিজ্ঞতার পরও যে ওজালান পিকেকেকে অস্ত্র ত্যাগ করতে বলছেন, সেটা হয়তো গোপন কোনো আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ঘটছে। এমনও ভাষ্য রয়েছে, সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর সেখানে তুরস্কের প্রভাব যেভাবে বাড়ছে, তাতে কুর্দিদের আন্তসীমান্ত সামরিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা দুরূহ হয়ে পড়ছে বলেই ওজালান নতুন অবস্থান নিলেন।
তুরস্কের জন্য সিরিয়ার বর্তমান অবস্থা একটা ঐতিহাসিক সুযোগ। যেহেতু ইরাক ও সিরিয়ায় ঢুকেও তুর্কির বাহিনী হামলা চালাতে পারছে, সে কারণে ইতিহাসে এই প্রথম কুর্দিরা সব সীমান্তে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় আছে। এই সুযোগে অনেক কম ছাড় দিয়েও হয়তো পিকেকেকে গেরিলা যুদ্ধ থেকে বের করে নিয়ে আসা যেতে পারে। … কুর্দি জাতিসত্তা তুরস্ক ও সিরিয়ার পাশাপাশি ইরাক ও ইরানেও আছে বড় সংখ্যায়।… পিকেকে অস্ত্রসমর্পণ করলে নিশ্চিতভাবে সেটা সিরিয়ার কুর্দি প্রতিরোধও দুর্বল করবে এবং তাদেরও রাজনৈতিক-সামরিকভাবে অনেকখানি নমনীয় ভূমিকা নিতে হবে সামনের দিনগুলোতে। কিন্তু সিরিয়া-ইরাকে আইএস এবং তুরস্কের বর্তমান সামরিক নীতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেসব জায়গার কুর্দিদের পক্ষে ওজালানের একতরফা যুদ্ধবিরতি অনুসরণের কোনো সুযোগ নেই।
… সবচেয়ে খারাপ বিকল্প হলো, একদম কোনো প্রাপ্তি ছাড়া কুর্দিদের অস্ত্রত্যাগ। তবে সেটাও এভাবে পরোক্ষে সমাজের জন্য লাভ বয়ে আনতে পারে যে, এ রকম একতরফা ছাড় তুরস্কজুড়ে কৃত্রিম সামরিকায়ন ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি বন্ধ করার যুক্তি তৈরি করবে।এতে দেশটিতে গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ আরও বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে এবং সেটা কুর্দিদের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগও বাড়াবে। বিষয়টা উল্টোভাবেও সত্য। কুর্দি-সমস্যার সমাধান তুরস্কে গণতান্ত্রিক সংস্কারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক বিষয়।… অস্ত্রহীন কুর্দিরা এভাবে তুরস্কে জাতিগত সম্পর্ক সংস্কারের অনেক গণতান্ত্রিক মিত্র পেতে পারে। কুর্দিবান্ধব পিপলস ইকুইটি অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক পার্টিও এই সুযোগে বিকশিত হতে পারে আরেক ধাপ। …”


