সম্প্রতি এটা আর গোপন নয় যে এখন সিংহভাগ মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই সংবাদ গ্রহণ করে। সংক্ষিপ্ত ক্লিপ থেকে শুরু করে বিশদ বিশ্লেষণ এবং পডকাস্ট পর্যন্ত সংবাদ গ্রহণ এবং প্রচারের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না। রাজনৈতিক সংবাদের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। যখন আমরা এক সময়কার উত্তপ্ত রাজনৈতিক আলোচনার কথা ভাবি তখন আমাদের মাথায় চায়ের দোকানের তর্ক-বিতর্ক আসতে পারে। তবে বাস্তবে, আজকালকার বেশিরভাগ সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনা সোশ্যাল মিডিয়ায় হয়। মতাদর্শগত বক্তব্য, তথ্যভিত্তিক পোস্ট বা প্রচলিত গণমাধ্যমের টক শো এবং সংবাদ বিশ্লেষণ – তরুণরা মূলত অনলাইনের মাধ্যমেই এসব গ্রহণ করে। যেভাবে দ্রুত কনটেন্ট তৈরি এবং প্রচার হচ্ছে তাতে বলতে গেলে প্রচলিত গণমাধ্যমও পেরে উঠতে পারছে না।
প্রকৃতপক্ষে, জেন-জি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে পছন্দ করে কারণ তারা দ্রুত, মাঠপর্যায়ের কভারেজ চায়। ছোট স্থানীয় সমস্যা হোক বা বড় জাতীয় সংকট। সোশ্যাল মিডিয়া তরুণদের দ্রুত এবং কার্যকরভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানোর প্রবণতা ব্যাপক। সোশ্যাল মিডিয়া আসার আগে খবর প্রিন্ট বা সম্প্রচার মাধ্যমের মাধ্যমে পাওয়া যেত। তখন কিছু আন্দোলন সংবাদ কভারেজ পেত আবার কিছু পেত না।সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে এই সমস্যা বদলেছে। ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এসব আমাদের দেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন যেগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয়ে পরে ব্যাপকভাবে জনসমর্থন পায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিক্স ও মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী জাকারিয়া তাসরিক বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া আন্দোলনের জন্য মানুষকে উৎসাহিত করার ভূমিকা পালন করেছে। অনেক প্রচলিত সংবাদমাধ্যম ভুল তথ্য ছড়ানোর ফলে মানুষ আরও বেশি সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছে। আমি ফেসবুকে এক ভিডিও পোস্ট করেছিলাম যেখানে টি.এস.সি. এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হচ্ছিল। এক ঘণ্টার মধ্যে ভিডিওটি ১০ হাজার রিঅ্যাক্ট এবং এক মিলিয়ন ভিউ পায়। বিভিন্ন সূত্র থেকে আসা ছোট ভিডিওগুলো আন্দোলনকে উত্তপ্ত করতে সাহায্য করেছিল।”
রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থী আশফি ইসলাম বলেন, “আমরা বেশিরভাগ তথ্য সোশ্যাল মিডিয়া থেকেই পেয়েছি। আমার বয়সী অনেকেই প্রচলিত সংবাদমাধ্যম দেখে না। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই একসাথে ঐক্যবদ্ধ ছিল। যখন সবাই একই ভিডিও শেয়ার করতে শুরু করল তখন আন্দোলনকে আর উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।” সোশ্যাল মিডিয়া তুলনামূলকভাবে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের চেয়ে ভালোভাবে প্রতিবাদকারীদের সংগঠিত করতে পারছে। মেডিকেল শিক্ষার্থী মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের একটি বড় কারণ হলো নাম গোপন রাখার সুবিধা। প্রচলিত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ্যে কথা বলার ঝুঁকি থাকে, এটি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সমস্যাও সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু অনলাইনে কথা বলার ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি কম থাকে এবং এটি আন্দোলনের জন্য ব্যাপক সমর্থন তৈরি করে।”
খুলনার একজন শিক্ষার্থী নোমায়ের নেহাল বলেন, “জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো আমাদের আন্দোলনকে কভার করেনি। কিন্তু স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং ফেসবুক-ভিত্তিক সংবাদ পেজগুলো আমাদের প্রতিবাদ সম্পর্কে সবাইকে আপডেট দিয়েছে।” জাকারিয়া বলেন, “তরুণদের আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা সফল ছিল। ফেসবুক-ভিত্তিক কর্মীরা সবাইকে এক্স (পূর্ববর্তী টুইটার) ব্যবহার করতে অনুরোধ করে। শেষ পর্যন্ত আল জাজিরা আমাদের দেশের প্রাক্তন মন্ত্রীদের সাক্ষাৎকার নেয়। এমনকি সরকার পুরো দেশের ইন্টারনেট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। এটাই সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তি বোঝানোর জন্য যথেষ্ট।” অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে। কারণ এটি যেমন সহিংসতা ও ঘৃণার প্রচার ঘটাতে পারে, তেমনি ভুল তথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।
মুজাহিদ বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুল তথ্য যাচাই করা হয় না এবং কোনও ঘৃণাত্মক বক্তব্য ছড়ানোর ক্ষেত্রেও দ্রুত কার্যকর হয়ে যায়। মানুষ অনেক সময় প্রোপাগান্ডা বলয়ে আবদ্ধ হয়ে গিয়ে আর সত্য যাচাইয়ের সুযোগ পায় না।”তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে সকলকে সংঘটিত রাখবে। সচেতনতা ও যথাযথ যাচাই-বাছাই বজায় রেখে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার করলে তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।


