এক হারানো ঐতিহ্য বাংলার মসলিন

বাংলার মসলিন একসময় সারা বিশ্বে বিলাসিতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল। এর সূক্ষ্মতা, নম্রতা এবং সূচিকর্মের জন্য এটি রাজকীয় ও অভিজাত মহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। প্রাচীনকালে বাংলার বয়নশিল্পীদের দক্ষ হাতে তৈরি এই অনন্য কাপড় ইতিহাসের এক মূল্যবান অংশ। তবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে এই ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যেতে বসে। ভারতীয় সূক্ষ্ম ও মিহি সুতি বস্ত্র (মসলিন) প্রাচীনতম নমুনাটি ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মমির শবাচ্ছাদনবস্ত্র হিসাবে মিশরে পাওয়া গিয়েছিল। দ্য পেরিপ্লাস অফ দ্য ইরিথ্রিয়ান সি (৬৩ খ্রি.) গ্রন্থে ভারতীয় তুলার প্রথম বাণিজ্যিক উল্লেখ পাওয়া যায়। উক্ত গ্রন্থে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইউরোপে মসলিম জাতিয় সূক্ষ্ম ও মিহি সুতি বস্ত্র রপ্তানির উল্লেখ রয়েছে। ভারতের পূর্ব তথা বাংলা (বঙ্গ) এবং উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে মসলিন উৎপাদিত হত, তবে গুণোমানের ক্ষেত্রে বাংলার মসলিন ছিল শ্রেষ্ঠ। গ্রন্থটির বিবরণ অনুসারে, বাংলার গঙ্গা বন্দর থেকে ইউরোপের বণিকগণ মসলিন সংগ্রহ করত।

প্রথম খ্রিস্টাব্দের প্রথম শতকে রোম সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে অভিজাত রোমান নারীরা মসলিন পরে দেহসৌষ্ঠব প্রদর্শন করতে ভালোবাসতেন। গ্রন্থটিতে মোটা ধরনের মসলিনকে মলোচিনা, প্রশস্ত ও মসৃণ মসলিনকে মোনাচি এবং সর্বোৎকৃষ্ট মসলিনকে গেনজেটিক নামে উল্লেখ করা হয়েছে। নবম শতকে রচিত আরব ভৌগোলিক সোলাইমানের ‘সিলসিলাত উত তাওয়ারীখে ‘রুমি’ নামক একটি রাজ্যের বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে এমন সূক্ষ্ম ও মিহি সুতি বস্ত্র পাওয়া যেত যে, ৪০ হাত লম্বা ও ২ হাত চাওড়া। এক টুকরো কাপড় আংটির ভিতর দিয়ে অনায়াসে নাড়াচড়া করা যেতো। তৎকালীন এই বস্ত্র তিনি সেখানে ব্যতীত আর কোথাও দেখেন নি।

খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে ও তার পরে মসুলে খুব সূক্ষ্ম সুতি কাপড় তৈরি করা হত। আরব বণিকরা এটিকে পণ্য হিসেবে ইউরোপে নিয়ে যায় এবং মন্ত্রমুগ্ধ ইউরোপীয়রা একে মসলিন বলে ডাকত। এর পর থেকেই অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুন্দর সুতির কাপড় মসলিন নামে পরিচিত হতে শুরু করে। চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলায় আগত মরক্কো দেশিয় পর্যটক ইবনে বতুতা তার কিতাবুর রেহালায় গ্রন্থে সোনারগাঁওয়ে তৈরি এ বস্ত্রের বিশেষ প্রশংসা করেন। বাংলার মসলিন কাপড়ের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতেও এই সূক্ষ্ম বস্ত্রের প্রচলন ছিল। গ্রিক ঐতিহাসিক মেগাস্থিনিস এবং পরবর্তীকালে প্লিনি ও পেরিপ্লাস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সি-তে উল্লেখ আছে, বাংলার গঙ্গা নদীর অববাহিকায় তৈরি সূক্ষ্ম কাপড় বিশ্ববাজারে সমাদৃত ছিল।

মসলিন কাপড় বিশেষভাবে তৈরি হতো ঢাকার সোনারগাঁ, বিক্রমপুর, তিতাবাড়ি ও জামালপুরে। এখানকার তাঁতিরা বিশেষভাবে ‘ফুটি কার্পাস’ নামক এক বিশেষ জাতের তুলা ব্যবহার করতেন। মসলিনের বিভিন্ন শ্রেণি ও ব্যবহার ছিল। মোগল আমলে মসলিনের কয়েকটি জনপ্রিয় প্রকারভেদ ছিল, যেমন -মলমল-ই-কাস সর্বোচ্চ মানের মসলিন, যা সম্রাট ও অভিজাতদের জন্য প্রস্তুত করা হতো। ঝুনঝুনি সূক্ষ্ম ও স্বচ্ছ কাপড়। এগুলো বিশেষ করে নারীদের রাজকীয় পোশাকে ব্যবহৃত হতো। শাবনাম এতই সূক্ষ্ম ছিলো যে একে ‘ভোরের শিশির’ বলা হতো। দুরিয়া ছিলো ঢেউ খেলানো নকশার জন্য পরিচিত। আর আলাবালি তুলনামূলকভাবে মোটা ও দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী।

১৭শ ও ১৮শ শতকে ইউরোপে মসলিন কাপড় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষত ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের রাজকীয় পরিবার এবং অভিজাত নারীরা এই কাপড় পরিধান করতেন। কথিত আছে, ফ্রান্সের রানী মারি অ্যান্টোনেট মসলিনের তৈরি পোশাক পরিধান করতেন। নেপোলিয়নের স্ত্রী জোসেফিন এই সূক্ষ্ম কাপড়কে অত্যন্ত পছন্দ করতেন। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মিলনসভাগুলোতে মসলিনের পোশাক অভিজাতদের ফ্যাশনের অন্যতম অংশ হয়ে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্য, তুরস্ক এবং মিশরের সম্রাট ও ধনী ব্যক্তিরাও মসলিনের জন্য বাংলার বণিকদের সঙ্গে বাণিজ্য করতেন।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা ভারত ও বাংলার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর দখল প্রতিষ্ঠা করে। এই সময়ের মধ্যেই মসলিন শিল্পে ধ্বংসের সূচনা ঘটে। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা ভারতীয় তুলা থেকে বোনা ব্রিটিশদের মিলের তৈরি সস্তা কাপড়ের প্রচলনের জন্য পরিকল্পিতভাবে মসলিন বুনন ধ্বংস করেছিল। ভারতে ব্রিটিশশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত করা বস্ত্রের উপরে ৭০ হতে ৮০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়। যেখানে ব্রিটেনে প্রস্তুত-করা আমদানীকৃত কাপড়ের উপরে মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ কর ছিল। এছাড়াও ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের ফলে তুলা থেকে কাপড় তৈরির যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়, যা হাতের তৈরি মসলিনের বাজার সংকুচিত করে।

এর ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের তাঁতশিল্পে ধস নামে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা মসলিন উৎপাদন বন্ধ করার জন্য মসলিন বয়নকারী তাঁতিদের হাতের বুড়ো আঙুল কেটে দিয়েছিল। তবে অধুনা অন্য আরেকটি দাবি বেশ যৌক্তিকভাবে সামনে উঠে এসেছে, তা হল তাঁতিদের হাত ব্রিটিশরা নয় বরং তারা নিজেরাই নিজেদের আঙ্গুল কেটে নিত যাতে এই তাঁতের কাজ আর না করতে হয়। হুমকিপ্রাপ্ত অনেক তাঁতি পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে পালিয়ে এসে পশ্চিমবঙ্গের পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলিতে বসতি স্থাপন করে। যা বাংলার সুতি পণ্যের জন্য বিখ্যাত মসলিন তাঁতিরা তাদের পরিচয় গোপন করার জন্য মোটা সুতা ব্যবহার করে কাপড় বুনতে শুরু করেছিল। এভাবে মসলিন বুনন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ব্রিটিশরা ভারতীয় বাজারে ম্যানচেস্টারের তুলনামূলক নিম্নমানের সস্তা কাপড় আমদানি শুরু করে। যার ফলে স্থানীয় তাঁতিরা বাধ্য হয়ে প্রতিযোগিতায় হার মানে।

এভাবে ১৯শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মসলিন কাপড় প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের একদল গবেষক দীর্ঘ গবেষণার পর ২০১৪ সালে বিলুপ্ত ফুটি কার্পাস তুলার জাত খুঁজে বের করতে সক্ষম হন। প্রথম পুনরুদ্ধারকৃত মসলিন ২০২১ সালে বাংলাদেশ গবেষণার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ঐতিহ্যবাহী মসলিন পুনরায় তৈরি করতে সক্ষম হয়। বিশ্ববাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে বাংলাদেশ সরকার মসলিনের ব্র্যান্ডিং ও বাণিজ্যিকীকরণের পরিকল্পনা করছে। যার দ্বারা আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে পুনরায় মসলিনকে তুলে ধরতে পারে।

মসলিন কেবল একটি কাপড় নয়, এটি বাংলার ঐতিহ্য, ইতিহাস ও শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে এটি হারিয়ে গেলেও সাম্প্রতিক গবেষণা ও প্রচেষ্টায় এটি পুনরুদ্ধারের আশা জাগিয়েছে। যদি সরকার ও শিল্প উদ্যোক্তারা একযোগে কাজ করে তবে একদিন মসলিন আবারও বিশ্ব দরবারে নিজের জায়গা ফিরে পাবে। মসলিন পুনরুদ্ধারের এই প্রচেষ্টা কেবল বস্ত্রশিল্পেরই পুনর্জাগরণ নয় বরং বাংলার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন