বাংলাদেশের হাজার হাজার জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য অভিবাসন এক মরিয়া পালানোর পথ হলেও এর মূল্য ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও উন্নয়ন সংস্থার (IIED) এক জরিপ অনুসারে জলবায়ুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল থেকে যারা বিদেশে অভিবাসন করেছেন তাদের প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে আধুনিক দাসত্বেরই শিকার হয়েছেন। গতকাল প্রকাশিত হওয়া IIED-এর গবেষণা “উন্মুক্ত ও নিপীড়িত: বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন ও আধুনিক দাসত্ব”, সেখানে বলা হয়েছে আধুনিক দাসত্ব বিভিন্ন রূপ নেয়।জরিপভুক্ত অভিবাসীরা মজুরি আটকে রাখা, চলাচলে বিধিনিষেধ, নির্যাতনমূলক পরিবেশ, হুমকি, ভয়ভীতি, এমনকি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
গবেষণাটি ২০২৩ ও ২০২৪ সালে IIED এবং অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন কর্মসূচি (OKUP) পরিচালিত করেছে, যার অর্থায়ন করেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের Modern Slavery Innovation Fund । জরিপটি দেশের ১৯টি ইউনিয়নের ৩৩টি গ্রামে ৬৪৮টি পরিবারের ওপর পরিচালিত হয়। এর মধ্যে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ১০টি এবং সিলেটের গোয়াইনঘাটের ৯টি ইউনিয়নকে জলবায়ু ঝুঁকির মাত্রার ভিত্তিতে বাছাই করা হয়। অংশগ্রহণকারী পরিবারের ৭০.০৬ শতাংশ অভিবাসী পরিবার (দেশীয় ও আন্তর্জাতিক), আর ২৯.৯৪ শতাংশ অভিবাসী নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, “দেশীয় অভিবাসীদের মধ্যে ৯২ শতাংশ অন্তত এক ধরনের আধুনিক দাসত্বের শিকার। যেখানে ৫২ শতাংশের বেশি তিন বা ততোধিক ধরনের নিপীড়ন সহ্য করেছেন।
প্রতিবেদন অনুসারে, এই সংকটের মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। গত ছয় দশকে বাংলাদেশে জলবায়ু- সম্পর্কিত দুর্যোগ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০-এর আগে যেখানে গড়ে বছরে চারটি দুরে্যাগ হতো সেখানে এখন তা বেড়ে সাতটিতে দাঁড়িয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা ফসল নষ্ট করেছে। গবাদি পশু ডুবিয়ে মেরেছে, সঞ্চয় ধ্বংস করেছে। ফলে বহু পরিবারের সামনে একমাত্র বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানান্তর। “পিরোজপুর ও সিলেটের মতো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায়, ৯৯ শতাংশ বাসিন্দা তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন, আর ৯০ শতাংশ বলছেন নদীভাঙন আরও খারাপ হয়েছে।” জীবিকা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় অভিবাসন ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
২০১১ সালের পর থেকে প্রায় ৮৪ শতাংশ পরিবার কাজের সন্ধানে ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে চলে গেছে-সেখানে তারা প্রায়শই শোষণমূলক শিল্পে কাজ করছে। আর ৮৮ শতাংশ পরিবার তাদের আত্মীয়দের বিদেশে পাঠিয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে তাদের অনেকেই চরম শ্রমিক নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, জলবায়ু- সংকটে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দেশীয় অভিবাসনের সম্ভাবনা ১৬১ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসনের সম্ভাবনা ২১৪ শতাংশ বেশি। এটি দেখায় কীভাবে জলবায়ুজনিত ধাক্কা মানুষকে বাধ্যতামূলক অভিবাসনের দিকে ঠেলে দেয়।
তবে যেসব পরিবারের শিক্ষা ও জমির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি তাদের আন্তর্জাতিক অভিবাসনের সম্ভাবনা ৩৫৬ শতাংশ বেশি-যা অভিবাসনের দ্বৈত প্রকৃতিকে তুলে ধরে। এটি একদিকে বেঁচে থাকার কৌশল, অন্যদিকে অভিযোজনের একটি মাধ্যম। IIED-এর প্রধান গবেষক ও প্রতিবেদনের সহলেখক ঋতু ভারদ্বাজ বলেন, “এ ধরনের সংকটের ধাক্কা কমাতে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। যেমন ভারতের গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প। বাংলাদেশ যেহেতু একটি নিম্ন-আয়ের দেশ। তাই হয়তো আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন হবে। তবে জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো তৈরির ওপর ভিত্তি করে একটি কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু করা গেলে এটি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য বিশাল সহায়ক হতে পারে।”
অভিবাসনকে নিরাপদ করার জন্য প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে জলবায়ু অর্থায়নের মাধ্যমে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা তৈরি এবং আরও সহনশীল ফসলের জাতের উন্নয়ন ও নিয়োগ সংস্থাগুলোর কঠোর নিয়ন্ত্রণ।


