বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচারের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গার মাখালডাঙ্গা ইউনিয়নের দীননাথপুর গ্রামে এক কৃষক ফসল রক্ষা করতে বিষ প্রয়োগ করলে পাঁচ – সাতটি শেয়াল, একটি গন্ধগোকুল, একটি বেজি, একটি পোষা কুকুরসহ বহু বন্যপ্রাণী প্রাণ হারায়। এই ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হলে বন অধিদপ্তর অভিযুক্ত কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা করে। দেশে বন্যপ্রাণী নিধনের এ প্রবণতা শুধু চুয়াডাঙ্গা নয় সারাদেশে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্যপ্রাণী আক্রান্ত হওয়ার ৩,৩০৪টি ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ২৬৯টি প্রাণী মৃত্যুবরণ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। বেঙ্গল ডিসকভারির একটি গবেষণায় দেখা যায়, আগস্টে বন্যপ্রাণী আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ছিল ৪৪টি, কিন্তু ডিসেম্বরে তা বেড়ে ১,৭১৬টি হয়েছে। এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ। যেখানে মোট আক্রান্তের ২৬ শতাংশ ঘটেছে, আর ঢাকা বিভাগের পরিমাণ ১৮ শতাংশ। সবচেয়ে কম আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে, সেখানে মাত্র ২ শতাংশ।
দেশের অন্যতম পাহাড়ি বনাঞ্চল রেমা-কালেঙ্গা, যা হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত। সেখানে বন্যপ্রাণী হত্যার একটি ঘটনা সম্প্রতি ঘটেছে। ২৩ জানুয়ারি, হাতিমারা চা বাগানে গাছ কাটার পর আগুন ধরানো হলে, সেখানে বসবাসকারী হনুমান, মায়াহরিণ, বিরল প্রজাতির কাঠবিড়ালী, পাখি সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী পুড়ে মারা যায়। এ ঘটনায় বেশ কিছু প্রাণী আহত হয়। বন্যপ্রাণী অপরাধ দমনে প্রসাশনের কাজ থেমে নেই। বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক অবৈধ চিড়িয়াখানায় বন্যপ্রাণী আটকে রাখা হয়, যা উদ্ধার করার জন্য অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে বন্যপ্রাণী পাচার ও হত্যা বেড়েছে। গত ৭ নভেম্বর কক্সবাজারের মহেশখালী শাপলাপুর এলাকায় ১২টি বিলুপ্তপ্রায় হনুমান পাচারের ঘটনা উদঘাটিত হয়, আর জানুয়ারিতে ঢাকা থেকে বিপন্ন প্রজাতির ৮টি মুখপোড়া হনুমান উদ্ধার করা হয়।
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী অপরাধের হটস্পটগুলোতে নজরদারি বাড়ানো গেলে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে বন্যপ্রাণীর মধ্যে স্তন্যপায়ী প্রাণী সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে, যার হার ৩৭শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পাখি, আক্রান্তের হার ২৯ শতাংশ, সরীসৃপের হার ২৫ শতাংশ, এবং জলজ প্রাণী ৯ শতাংশ। বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের কর্মকর্তা রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, বন্যপ্রাণী রক্ষা ও পাচার প্রতিরোধে সরকার নিরলস কাজ করছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও মনোযোগী হতে হবে, যাতে বন্যপ্রাণী পাচার, শিকার ও হত্যার ঘটনা কমানো যায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যপ্রাণী অপরাধের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার ফলে, পরিবেশকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। তাদের মতে এসব অপরাধ দমনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নজরদারি বৃদ্ধি ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আরও কার্যকরী হবে।


