গত জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের চেয়ারে ফেরার পরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে পড়ার ঘোষণা দেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকেও দেশকে নেন সরিয়ে। গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ইউএসএআইডির কার্যক্রমও দেন বন্ধ করে। এবার কি তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্ব ব্যাংকের মতো বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেবেন, আলোচনা এখন তা নিয়ে। বিশেষ করে জি-২০ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের অনুপস্থিতি এই গুঞ্জনকেই ভিত্তি দিচ্ছে, সেই সঙ্গে বৈশ্বিক আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি করছে অস্বস্তি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন প্রায় শেষ তখন বিজয়ী পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মিলে যুদ্ধবিক্ষত বিশ্বের অর্থনীতিতে পুনরায় দাঁড় করানোর লক্ষ্যে ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস সম্মেলনের মাধ্যমে গড়ে তুলেছিল এই দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তারপর থেকে যে কোনও দুর্দশাপীড়িত দেশের অর্থ পাওয়ার শেষ ঠিকানা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইএমএফ। আর্থিক সঙ্কটে জর্জর ইউরোপের দেশ গ্রিস থেকে শুরু করে দেনার ভারে নুইয়ে পড়া লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা, এমনকি ১৯৭৬ সালে যুক্তরাজ্যেরও সহায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল আইএমএফ। জরুরি ভিত্তিতে কোনও দেশের লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় অর্থ ধার দিয়ে থাকে আইএমএফ। তবে এই ধার দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু শর্তও জুড়ে দেয় সংস্থাটি। এর মধ্যে সাধারণত থাকে ঋণ গ্রহীতা দেশে আর্থিক খাত সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, বাজেটে স্বচ্ছতা আনা, দুর্নীতি দূর করা, রাজস্ব আয় বাড়ানো ইত্যাদি।
বিশ্ব ব্যাংক বিভিন্ন দেশকে অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। তাদের ঋণ সড়ক, রেলপথ তৈরি থেকে শুরু করে বাধ নির্মাণসহ আর্থিক খাত উন্নয়নে দেওয়া হয়ে থাকে।বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ দুটি প্রতিষ্ঠানই সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নানা নীতি পরামর্শ দিয়ে থাকে।বিশ্ব ব্যাংকের তহবিলের উৎস বেশ কয়েকটি। শুরুতে ধনী সদস্য দেশগুলো এতে তহবিল জুগিয়ে আসছিল। এখন বিশ্ব ব্যাংক পুঁজিবাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহ করছে। আইএমএফের তহবিলও আসে সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে। কে কত অর্থ দেবে, তার একটি কোটা নির্ধারিত রয়েছে।
বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ উভয়েরই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তহবিলে কে কত অর্থ দিল, সেই দেশ অগ্রাধিকার পায়। কেননা এখানে এক দেশ এক ভোেট প্রথা নেই; কে কত অর্থ তহবিলে রাখল, তার ওপর নির্ধারিত হয় ভোটের হার। বর্তমানে আইএমএফের সদস্য দেশের সংখ্যা ১৯১। বিশ্ব ব্যাংকের সদস্য হতে হলে আগে আইএমএফের সদস্য হতে হয়। বিশ্ব ব্যাংকের সদস্য দেশ এখন ১৮৯টি।যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো বিশ্ব ব্যাংক আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানকে তহবিল জুগিয়ে থাকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থাকে সুস্থির রাখার লক্ষ্যে। মুক্ত বাজার অর্থনীতি যেন কার্যকর থাকে, সেই জন্য। বড় অঙ্কের অর্থ জুগিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্র এই দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিশর, পাকিস্তান, জর্ডানের মতো দেশকে সহায়তা দেয়, যেখানে ওয়াশিংটনের কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে।
জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো কিংবা রাজস্ব আদায় বাড়াতে সরকারকে খড়গহস্ত হওয়ার মতো অজনপ্রিয় পরামর্শ দেওয়ার কারণে উন্নয়নশীল অনেক দেশে প্রায়ই বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় আইএমএফকে। কিউবা, উত্তর কোরিয়া, তাইওয়ানের মতো দেশগুলো আইএমএফের সদস্যই হয়নি। বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ দুটোরই সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে। প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য যুক্তরাষ্ট্র দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরই একক দেশ হিসাবে সবচেয়ে বড় শেয়ারের মালিক। আইএমএফে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার ১৬ শতাংশ, বিশ্ব ব্যাংকে তার খানিকটা কম। এই দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বিশ্বের অন্য দেশগুলোর ওপর ওয়াশিংটনকে ছড়ি ঘোরাতে সহায়তা করে। তুলনামূলক কম খরচ করে যেখানে গোটা বিশ্বের ওপর প্রভাব রাখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সেই সুযোগ ছেড়ে দেওয়াকে বিশেষজ্ঞদেরও অবাক করবে।
সেই সঙ্গে তার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতে চীনের প্রভাব আরও বাড়িয়ে তুলবে, যেখানে চীনের হাতে এখন আইএমএফের ৫ শতাংশের মতো শেয়ার রয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে দেশটির কোম্পানিগুলোর বিশ্ব ব্যাংকের তহবিল পাওয়া কমে যেতে পারে। ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলো সতর্ক করে আসছে, তেমনটা ঘটলে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এখনকার ট্রিপল-এ রেটিং ঝুঁকিতে পড়তে পারে, কারণ তাদের ধার দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাবে।


