যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ জুড়ে মানুষের ব্যাপক আগ্রহকে প্রতিফলন স্বরূপ ট্যারোেট কার্ডের বিক্রি ২০২৪ সালে রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিলো। এই কার্ডগুলো এখন সাধারণ মেয়েদের আড্ডায় জায়গা করে নিয়েছে, জন্মদিনের পার্টিতেও মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তো এটি রীতিমতো ট্রেন্ড হয়ে উঠেছে। যদিও এটি খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখার কিছু নয়। তবু কেন এই প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, ট্যারোট কার্ড উৎপাদকদের জন্য এর কী প্রভাব পড়ছে এবং কী ধরনের অপ্রত্যাশিত ফলাফল দেখা দিতে পারে, এসব দিক পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।
বোর্ড গেম থেকে ট্রেন্ডে পরিণত হওয়া ট্যারোট কার্ডের সূচনা হয়েছিল সাধারণ বোর্ড গেম হিসেবে। ঠিক যেমনটি আমরা ছুটির দিনে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে অভ্যস্ত। ১৫শ শতকের ইউরোপে এগুলো কেবল খেলোয়াড়দের জন্য কার্ড হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। যেখানে দেবতা ও নৈতিকতার প্রতিচ্ছবি থাকত। এগুলো রেনেসাঁ যুগের শিল্পধারা ও গ্রিক-রোমান পুরাণের প্রভাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তখন এতে বিশেষ কিছু ছিল না, এটি ছিল দাবা বা “ফেন্সিং বোর্ড” নামের গেমের মতোই আরেকটি বিনোদনের মাধ্যম। পরিবর্তন আসে ১৮শ শতকে, যখন দাবি করা হয় যে ট্যারোট কার্ডের মধ্যে প্রাচীন মিশরের এক গোপন পাঠ্যগ্রন্থ, “Book of Thoth”-এর (টোথের গ্রন্থ) চিহ্ন লুকিয়ে আছে (যদিও সত্যিই ছিল কি না, তা কেউ জানে না)।
এই আবিষ্কারই কার্ডগুলোর বাণিজ্যিকীকরণ শুরু করে! এবার আর সাধারণ গেম হিসেবে নয় বরং ভাগ্য গণনার এক যন্ত্র হিসেবে। অতীতের দিকে তাকালে বোঝা যায় এটি নিছক একটি কৌশল, যা এক সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক প্রবাহ সৃষ্টি করেছিল। সে সময় এটি সফল হয়েছিল এবং ধীরে ধীরে এমন এক প্রবণতা তৈরি করেছিল যা যুগের পর যুগ ছড়িয়ে পড়েছে। ট্যারোট কার্ড নিয়ে গত কয়েক দশকে খুব বেশি আলোচনা না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎ করেই এর জনপ্রিয়তা বেড়ে গেছে। কেন? কারণটি বেশ সুস্পষ্ট: কোভিড-১৯। আসুন, ব্যাখ্যা করা যাকড় ২০২০ সালের প্রথমার্ধে ট্যারোট মানুষের জন্য নিয়ন্ত্রণের এক বিকল্প অনুভূতি তৈরি করেছিল। যে সময়ে কেউই জীবন যাপন নিয়ে নিশ্চিত ছিল না সে সময়ে এটি যেন একটি আশ্রয় হয়ে উঠেছিল।
বিশ্বজুড়ে মহামারির কারণে যখন দেশগুলো কঠোর লকডাউনে চলে যায় তখন মানুষের মনে এক অজানা আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা কাজ করছিল। মনোবিজ্ঞান বলে, যখন কেউ অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে তার যদি সামনে কেউ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে যে কোনো কিছু ব্যাখ্যা দিতে থাকে তা যতই অমূলক হোক না কেন, তখন মানুষ সেটাকে বিশ্বাস করতে শুরু করে। “সায়েন্স ডাইরেক্ট”-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন চাপের মধ্যে থাকে তখন তারা যাচাই-বাছাই ছাড়া অবৈজ্ঞানিক তথ্যের প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হয়। যার মধ্যে ট্যারোট কার্ডের মতো জিনিসও পড়ে। ২০২০ সালে এই কারণেই জ্যোতিষ-ভিত্তিক অ্যাপগুলোর ব্যবহার ১০ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং কিছু অ্যাপ গুগল প্লেতে এক মিলিয়নেরও বেশি ডাউনলোড হয়ে গিয়েছিলো।
বলতে গেলে, লকডাউনের সময়ে ট্যারোট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একধরনের “চিউইং গাম” হয়ে উঠেছিল। গড়ে বৈশ্বিক লকডাউন প্রায় দুই থেকে তিন মাস স্থায়ী হয়েছিল (কিছু দেশে আরও বেশি)। যদি আপনি সেই সময়টা ভুলে গিয়ে থাকেন, তাহলে মনে করিয়ে দিই। একটি বা দুটি রুমে আটকে থাকা, প্রথম সপ্তাহেই সব সিনেমা ও সিরিজ দেখে ফেলা, আর পরিবারের সবার সঙ্গে অকারণে ঝগড়া করা। এই অবস্থাই ছিল তখনকার বাস্তবতা। এরপর একমাত্র অবশিষ্ট কার্যকলাপ ছিল ইন্টারনেট স্কুল করা। এই সময়েই ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে ট্যারোট কমিউনিটিগুলো ব্লগ ও ভিডিও বানিয়ে নতুন দর্শকদের আকৃষ্ট করা শুরু করে। তারা এমন ব্যক্তিদের মনোযোগ কাড়ে, যারা আসলে নিজেদের দেখা কনটেন্টের বিশ্লেষণ খুব একটা করত না।
ট্যারোটের বর্তমান জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রধান কারণ হলো জেন জি যেভাবে দ্রুত সব্রকম নতুন ট্রেন্ড গ্রহণ করে! Springtide Research Institute-এর এক গবেষণা বলছে, ১৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী জেন জি-এর ৫১% ট্যারোট বা এর মতো অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করে। আরেকটি চমকপ্রদ সংখ্যা ৮ মিলিয়ন। এটি হলো ২০২৪ সালে টিকটকে #tarot হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে আপলোড করা ভিডিওর সংখ্যা। তাহলে কল্পনা করুন, হ্যাশট্যাগ ছাড়াই আরও কত ভিডিও পোস্ট হয়েছে! সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরেও ট্যারোটের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে সেলফ-ডিসকভারি, মাইন্ডফুলনেস, এবং বিকল্প মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ।
বর্তমান যুগের “ওয়েলনেস ট্রেন্ড” মানুষকে নিজেদের সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শেখায়ড়”আমি কে?”, “আমি কী চাই?”, “আমি কেমন অনুভব করছি?” কিন্তু এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সবসময় পরিষ্কার থাকে না। এই সময়েই ট্যারোট কার্ড সহজ এবং তাৎক্ষণিক উত্তর দিয়ে মানুষের কৌতূহল মেটানোর চেষ্টা করে, যা অনেকের কাছে ব্যক্তিগত, তাৎপর্যপূর্ণ, এমনকি কিছুটা স্বস্তিদায়কও মনে হয়।মনোবিজ্ঞানীরা বলেন ট্যারোট একধরনের মানসিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। মানুষ অবচেতনে বিশ্বাস করে যে তারা চিন্তা বা প্রতীকের মাধ্যমে বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এটি মূলত নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় এবং অসহায়ত্বের অনুভূতি থেকে উদ্ভূত প্রতিক্রিয়া।
তবে আরেকটি সত্য হলো যদিও ট্যারোটের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে তবুও অধিকংশ মানুষ এটি নিছক মজার খেলা হিসেবে ব্যবহার করে।বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি সামাজিক বিনোদন। যেগুলো বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। একটি আড্ডায় বা সাপ্তাহিক ব্রাঞ্চে নতুন কিছু বলার সুযোগ তৈরি করে।


