ট্রাম্প কেন বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করলেন ?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন, কানাডা ও মেক্সিকোর বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন। এপ্রিল মাসে আরও অনেক দেশের পণ্যেই তিনি শুল্ক আরোপ করবেন। মূলত ট্রাম্প এই ঘোষণা দিয়েছেন বিদ্যমান বাণিজ্য-ঘাটতি মেটাতে। বাণিজ্যযুদ্ধের পেছনের অন্যতম কারণ হচ্ছে, এই দেশগুলোর তাদের বাজার যুক্তরাষ্ট্রের সব পণ্যের জন্য খোলা রাখেনি। কিন্তু তার বিপরীতে এসব দেশের অধিকাংশ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে যা বৈষম্যমূলক মনে হয়েছে। এ ছাড়া মুদ্রার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে সুবিধা আদায় করে নেওয়া, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি ও সরকারি ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে চীন নিজের কোম্পানিগুলোকে কম মূল্যে পণ্য উৎপাদনের সুযোগ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরির অভিযোগও আছে মার্কিন প্রশাসনের।

যন্ত্রের ব্যবহারে উৎপাদন বাড়ে, অনেক মানুষ চাকরি হারায়। অনেক মানুষ অর্থনৈতিক সংকটের কবলে পড়ে। তবে সাধারণ মানুষকে বোঝানো সহজ করতে জনতুষ্টিবাদী নেতারা যন্ত্রের বদলে বিদেশিদের ঘাড়ে দোষ চাপান। তাঁরা অভিবাসীদেরও দোষ দেন। অভিবাসীরা চাকরি নিয়ে নিচ্ছে বা তাদের সংস্কৃতি আলাদা-এই তাদের প্রচারণা। ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত এই স্লোগান তুলে জনপ্রিয়তা পান। তাঁর ভাষ্য ছিল, বিশ্বায়নের কারণে চীনে সব কারখানা চলে গেছে, তাই মার্কিন নাগরিকেরা কাজ পাচ্ছেন না। এবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।

দেশে যদি আমদানির অর্থমূল্য রপ্তানির চেয়ে বেশি হয়, তার অর্থ হলো, দেশের সরকার বা নাগরিকেরা আয় বা কর সংগ্রহের তুলনায় বেশি ব্যয় করছেন। অর্থাৎ সেই দেশের জাতীয় সঞ্চয় তাদের জাতীয় বিনিয়োগের চেয়ে কম। দেশে বাণিজ্য-ঘাটতি হলে বহির্বিশ্ব থেকে ঋণ করতে হবে ঘাটতি মেটাতে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ঠিক তাই করছে। দেশটির জাতীয় ঋণ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩৯ সালে প্রথম জাতীয় ঋণসীমা নির্ধারিত হয় ৪৫ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এরপর এখন পর্যন্ত ১০৩ বার এই ঋণসীমা বাড়াতে হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে দেশটির জাতীয় ঋণ অনুমোদিত সীমার ৯৮ শতাংশে উঠে যায়, ২০০১ সালে যা ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ। বর্তমানে এই সীমা ৩৩ লাখ কোটি ডলার।

২০১৬ সালে নির্বাচিত হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ধনীদের করছাড় দিয়েছিলেন। এরপর কোভিডের সময় মানুষকে প্রণোদনা দিতে মার্কিন সরকারকে বিপুল পরিমাণে ঋণ নিতে হয়েছে। সে কারণে গত কয়েক বছরে মার্কিন সরকারের ঋণ অনেকটা বেড়েছে। এখন ট্রাম্প আবার ধনীদের ছাড় দিলে রাজস্ব আয় কমবে। তার সঙ্গে ইসরায়েল-হামাস ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণে সহায়তা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো। ফলে ট্রাম্প যে যুদ্ধ অর্থায়ন বন্ধের অঙ্গীকার করেছিলেন, মানুষ তাতে সমর্থন দেয়।

ট্রাম্প আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে এক ঢিলে বহু পাখি মারার কথা ভাবছেন। একদিকে যেমন বিভিন্ন দেশকে বিভিন্ন কারণে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা, তেমনি ট্রাম্প আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে সরকারি বাজেট-ঘাটতি পূরণ করার কথাও ভাবছেন, যাতে আয়কর বাড়াতে না হয়। তিনি মনে করছেন, আমদানি শুল্ক আরোপ করা হলে দেশের শিল্প চাঙা হবে। এমনকি কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে উৎপাদনকেন্দ্র তৈরি করলে তারা আমদানি শুল্কসহ অন্যান্য কর ছাড় পাবে। সরকারি বাজেট-ঘাটতি কমানোর জন্য দুটি পথ খোলা আছে, কর বাড়ানো বা সরকারি ব্যয় কমানো। প্রথম পথটি ট্রাম্প অবশ্যই নেবেন না, কারণ, তিনি ভোটারদের করহাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

এরপর রইল দ্বিতীয় পথ। নির্বিচারে ব্যয় কমানো সরকারি সঞ্চয় বাড়ানোর চটজলদি পথ। ট্রাম্প সরকারের আয়তন কমাচ্ছেন। চাকরি হারাচ্ছেন অনেক সরকারি কর্মী। আমদানি শুল্ক ট্রাম্পের কৌশলগত অস্ত্র। তবে এই অস্ত্রের প্রভাব আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন