৮ মার্চ ২০১৪ সালে, মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিংগামী মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৩৭০ তার নির্ধারিত পথ থেকে সরে গিয়ে পশ্চিম দিকে মালয় উপদ্বীপের ওপর দিয়ে উড়ে যায়।১৫টি দেশের ২৩৯ জন যাত্রী ও ক্রু নিয়ে বোয়িং ৭৭৭বিমানটি রাডার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর দক্ষিণ দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উড়ে যায় বলে ধারণা করা হয়। কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর এটি দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে বিধ্বস্ত হতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত ব্যাপক অনুসন্ধান কার্যক্রমের পরও কোনো উত্তর মেলেনিড়কোনো ভুক্তভোগীর সন্ধান মেলেনি, এমনকি বিমানটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিমানটি কেন পথভ্রষ্ট হয়েছিল এবং এটি বর্তমানে কোথায় আছে, সেই প্রশ্ন এখনো বিমান চলাচলের ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্য। মালয়েশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী অ্যান্থনি লোকে ফেব্রুয়ারিতে জানান, নতুন করে এর অনুসন্ধান চালানোর জন্য জাহাজ প্রস্তুত করা হচ্ছে।প্রথম পর্যায়ের অনুসন্ধান ৫২ দিন ধরে চলে, যা মূলত আকাশপথে পরিচালিত হয়। এতে ৩৩৪টি অনুসন্ধান ফ্লাইট পরিচালনা করা হয় এবং ১৭ লক্ষ বর্গমাইল এলাকা তল্লাশি করা হয়।২০১৭ সালের জানুয়ারিতে, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও চীন যৌথভাবে ১৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ভারত মহাসাগরের তলদেশের ৪৬,০০০ বর্গমাইল এলাকা অনুসন্ধানের পর অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে।
পরবর্তী বছর মালয়েশিয়ার সরকার নিখোঁজ যাত্রীদের পরিবারের চাপে, ওশান ইনফিনিটি নামের একটি কোম্পানির সঙ্গে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করে। কয়েক মাস অনুসন্ধানের পরও কোনো তথ্য না পাওয়ায় ওশান ইনফিনিটি অভিযান বন্ধ করে দেয়।যদিও বিধ্বস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি, তবু প্রায় ২০টি টুকরো বিভিন্ন স্থানে পাওয়া গেছে, যেগুলো ফ্লাইট ৩৭০-এর বলে ধারণা করা হয়। এগুলো আফ্রিকার মূল ভূখণ্ড ও ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন দ্বীপড়মাদাগাস্কার, মরিশাস, রিইউনিয়ন ও রদ্রিগেসড়এর উপকূলে পাওয়া যায়।২০১৫ সালের গ্রীষ্মে, রিইউনিয়ন দ্বীপে একটি বড় ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, যা বোয়িং ৭৭৭ বিমানের ফ্ল্যাপের অংশ ছিল। এটি ফ্লাইট ৩৭০-এর বলে মনে করা হয়।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোজাম্বিক উপকূলে একটি নির্জন বালিয়াড়িতে ফাইবারগ্লাস কম্পোজিট ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি একটি ত্রিভুজাকৃতির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, যার গায়ে লেখা ছিল “No Step”।সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়া সরকার নিশ্চিত করে যে, তানজানিয়ার এক দ্বীপে পাওয়া একটি ডানা ফ্লাইট ৩৭০-এরই অংশ ছিল। অস্ট্রেলিয়ান ট্রান্সপোর্ট সেফটি ব্যুরো এর শনাক্তকরণ নম্বর মিলিয়ে এ তথ্য নিশ্চিত করে।বিমানটির নিখোঁজ হওয়া নিয়ে নানা ধরনের তত্ত্ব রয়েছে। কিছু কল্পনাপ্রসূত আবার কিছু বিতর্কিত। তথ্যের অভাবের কারণে তদন্তকারীরা ও সাধারণ জনগণ নানা দিক থেকে এই রহস্যের ব্যাখ্যা খুঁজতে চেয়েছেন।
কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন বিমানটি জ্বালানি শেষ হয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। আরেকটি তত্ত্ব বলছে, পাইলটরা জরুরি অবতরণের চেষ্টা করেছিলেন। কেউ কেউ ধারণা করেন, পাইলটরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি ছিনতাই করা হয়েছিল।সরকারি প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছিল?চার বছরের বেশি সময় ধরে তদন্ত ও অনুসন্ধানের পর, ২০১৮ সালে ৪৯৫ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যেখানে বিমানটির ভাগ্য সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে ভুক্তভোগীদের পরিবার প্রচণ্ডভাবে হতাশ হয়, কারণ তারা অন্তত কিছুটা হলেও নিশ্চিত হতে চেয়েছিল।
নিরাপত্তা তদন্ত দলের প্রধান কক সু চোন জানান, প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ীড়যেমন বিমানের পথ পরিবর্তন এবং ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করাড়এসব “অবৈধ হস্তক্ষেপের” (unlawful interference) ইঙ্গিত দেয়, যা ছিনতাইয়ের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে। তবে কে বা কেন এ কাজটি করেছে, তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।প্রতিবেদনে পাইলট জাহারি আহমদ শাহ ও সহকারী পাইলট ফারিক আবদুল হামিদসহ সব যাত্রীদের আর্থিক অবস্থা, স্বাস্থ্য, রেডিও যোগাযোগের কণ্ঠস্বর এবং সেদিন তাদের হাঁটার ভঙ্গিও বিশ্লেষণ করা হয়। কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি।বিমানটি নিখোঁজ হওয়ার এক দশকের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখনো কোনো নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যায়নি, কোনো ধ্বংসাবশেষও পাওয়া যায়নি। তবে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হতে যাচ্ছে।
মালয়েশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী লোকে ২৫ ফেব্রুয়ারি কুয়ালালামপুরে জানান, “আমরা অনুসন্ধান পুনরায় শুরু করার জন্য মৌলিক অনুমোদন দিয়েছি,” ওশান ইনফিনিটি তাদের আগের অনুসন্ধান এলাকায় ফাঁক থেকে যাওয়া স্থানগুলো পরীক্ষা করবে। “আমরা এখনই কিছু অনুমান করতে চাই না,” তিনি বলেন।ফেব্রুয়ারি ২৬ তারিখে এক ইমেইলে ওশান ইনফিনিটি জানিয়েছে যে, তাদের কাছে নতুন করে শেয়ার করার মতো কোনো তথ্য নেই।বর্তমানে ওশান ইনফিনিটি পরিচালিত “আরমাডা ৭৮০৬” নামক একটি জাহাজ অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলের ভারত মহাসাগরে আবারও অনুসন্ধানে নিয়োজিত রয়েছে।


