বায়োস্কোপ থেকে নেটফ্লিক্স ! সংস্কৃতি ও বিনোদনের বিবর্তনে ঢাকা ।
বিশ্বায়ন বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া, যা বিশ্বব্যাপী দেশ, সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে গভীর সংযোগ সৃষ্টি করে, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতিসহ অসংখ্য ক্ষেত্রে বিপুল পরিবর্তন আনে। যার ফলে মানব সমাজের কাঠামো ও জীবনধারা অনেক দ্রুত বিবর্তিত হয়।সাংস্কৃতিক বিবর্তন (Cultural Evolution) এই পরিবর্তনের একটি স্বাভাবিক এবং গুরুত্বপূর্ণ দিক, যেখানে জাতিগত সংস্কৃতির ভেতরে হরহামেশাই নতুন নতুন সাংস্কৃতিক উপাদান যুক্ত হচ্ছে এবং পুরোনো সংস্কৃতি নতুনভাবে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সমাজের আচার-অনুষ্ঠান, ভাষা, জীবনধারা এবং মূল্যবোধের উপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
ঢাকা, বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র, এই শহর বর্তমান সাংস্কৃতিক বিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ। বিগত কয়েক দশকে বিশ্বায়নের প্রভাবে ঢাকার সংস্কৃতি, জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস ও বিনোদন দৃশ্যমানভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ঢাকার সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ধাপের দিকে তাকাতে চাইলে আমাদের অনেক পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯৭০-৮০ এর দশকের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির প্রভাবে নজর দিলে সে সময় ঢাকার সংস্কৃতি ছিল বেশ ঐতিহ্যবাহী। বায়োস্কোপ, যাত্রা, পালাগান এবং রেডিও অনুষ্ঠান ছিল বিনোদনের মূল মাধ্যম। ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মধ্যে পাঞ্জাবি, শাড়ি এবং লুঙ্গির ব্যবহার ছিল ব্যাপক।
১৯৯০-২০০০ এর সময়ে এসে উপনিবেশিক আধিপত্য, প্রযুক্তি ও উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রভাবে বাংলাদেশের প্রবাসীদের সংখ্যা বেড়ে যায়, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে। তাদের পাঠানো রেমিটেন্স অর্থনীতিতে যেমন প্রভাব ফেলে, তেমনই সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনে। টেলিভিশন জনপ্রিয় হতে শুরু করে, এবং ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক প্রভাব ঢাকার জীবনে প্রবেশ করে। পোশাকে ও বিনোদনে পশ্চিমা ধারার সংমিশ্রণ ঘটে।
২০০০-২০১০ এর মধ্যেকার সময় থেকে এই প্রান্তে ডিজিটাল যুগের আগমন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হতে থাকে। এই সময় মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ঢাকার সংস্কৃতিতে একরকম বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। ইউটিউব, ফেসবুক এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোর বৈচিত্র্য তরুণ সমাজকে বৈশ্বিক সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে। ফাস্ট ফুড ও বহুজাতিক কোম্পানির আগমনে খাদ্যাভ্যাসও বদলাতে থাকে। ঢাকায় ম্যাকডোনাল্ডস, কে এফ সি, পিজা হাটের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড জনপ্রিয় হয়ে ওঠে মানুষের কাছে।
বর্তমানে ঢাকা একটি বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক শহরে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা ও দেশীয় সংস্কৃতির মিশ্রণে তৈরি হয়েছে নতুন এক সংস্কৃতি। হিপহপ, কোরিয়ান পপ (ক-ঢ়ড়ঢ়), হলিউড ও বলিউডের প্রভাব তরুণদের মধ্যে ব্যাপক। পাশাপাশি লোকজ সংগীত ও ঐতিহ্যবাহী খাবারও পুনরায় জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশি সংস্কৃতির পাশাপাশি গ্লোবাল ট্রেন্ড অনুসরণ করছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, স্ট্রিমিং সার্ভিস এবং ডিজিটাল মিডিয়া সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে সকলের কাছে। পাশাপাশি ফাস্ট ফুড, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও ডিজাইনের অনুরক্ত হয়ে উঠছে নতুন প্রজন্ম। এই সাংস্কৃতিক বিবর্তন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করলেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও বয়ে এনেছে।


