জ্বালানি নিয়ে সামনের গরমে কি হবে তা নিয়ে শঙ্কায় আছি। সামনের বাজেটের কাঠামোর ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমনের সংগ্রহ অভিযানে দুর্নীতি রয়ে গেছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা এখনও হুমকিতে রয়েছে।
‘অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সেক্টর বেশি মনোযোগ পেলেও অর্থনৈতিক সংস্কারে কোনো মনোযোগ নেই। সরকারের এই মূহুর্তে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের বাইরে তেমন কোনো অর্থনৈতিক মেনিফেস্টো নেই। অনেকেই বলছেন, অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই সরকার আগের সরকারের মতোই কাজ করছে। প্রত্যক্ষ কর না বাড়িয়ে অবিবেচকভাবে ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে।’ ১৮ জানুয়ারি রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘শ্বেতপত্র ও অতঃপর: অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, সংস্কার ও জাতীয় বাজেট’ শীর্ষক সিম্পোজিয়ামে এসব কথা বলেছেন শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি নিয়ে সামনের গরমে কি হবে তা নিয়ে শঙ্কায় আছি। সামনের বাজেটের কাঠামোর ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমনের সংগ্রহ অভিযানে দুর্নীতি রয়ে গেছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা এখনও হুমকিতে রয়েছে। কৃষক তার ফসলের মূল্য পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কার কাজের প্রশংসা করলেও চলমান পদক্ষেপ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে অস্থিরতা চলছে।’ সামস্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষার প্রতি নজর বাড়াতে আহ্বান জানান দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, এগুলো নিশ্চিত করতে না পারলে যারা সংস্কারকে গতিশীল করতে চান, তাঁরা ধৈর্যহারা হয়ে যাবেন।
এই সরকার কী ধরনের অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার রেখে যাবে, সেই প্রশ্ন তুলে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘সুষম অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে যে ধরনের প্রশাসনিক কাঠামো বা সংস্কার দরকার, সে রকমের কোনো রূপরেখা আমরা দেখলাম না।’ অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেন দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো, যেগুলো অনেক দিন ধরে চলমান, এখন এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে এগুলোর সমাধান করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি এবং কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি বলেন অন্তর্বর্তী সরকারকে যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যেমন কম ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, দুর্নীতি, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অপর্যাপ্ত আর্থিক খাত, সেগুলো নতুন কিছু নয়। সিস্টেমিক সমস্যা, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে এক ধরনের ক্রনি ক্যাপিটালিজমের সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে সময়মতো পরিশোধ না করার ফলে অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে।তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারকে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধানে সম্ভাব্য সমাধান চিহ্নিত করতে হবে, যাতে নির্বাচিত সরকার এগুলোর বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি প্রদর্শন করতে পারে।
সিম্পোজিয়ামে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘যারা ঋণখেলাপি এবং দেশের টাকা পাচার করেছে, তারা যেন কোনোভাবেই নমিনেশন না পান, আমরা সে চেষ্টাই করব। আমরা সংস্কারের বিষয়ে দুই বছর আগেই বলেছি। এজন্য ৩১ দফা আমরা দিয়েছি।অর্থনৈতিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সংস্কার। আমরা রাজনৈতিক সংস্কারে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। অনেকে এই গণঅভ্যুত্থানকে বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করেন। আমি বলব, এটা গণঅভ্যুত্থান। এজন্য আমরা রাজনৈতিক সংস্কারের কথা বলছি।
বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, ‘টাকা পাচারকারীরা ও বিদ্যুৎ প্রকল্প যারা করেছে তারাই নির্বাচনে অর্থায়ন করবে। সেগুলো থাকবেই। আমাদের চেষ্টা করতে হবে এসব থেকে বেরিয়ে আসার। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা চেষ্টা করব যতটুকু সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়।’ সানেম নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘রাজনৈতিক অর্থনীতির সমস্যাগুলো গত পাঁচ দশকের অধিক সময় ধরেই ছিল। দেড় দশকে সমস্যাগুলো অনেক জটিল হয়েছে, অনেক গভীর হয়েছে। নতুন করে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।’
সেলিম রায়হান বলেন, শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদন জমা হওয়ার দেড় মাস পার হলেও সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার কিছুই করেনি। শ্বেতপত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাও হয়নি। সিপিডির ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সাতটি মেগা প্রজেক্ট রিভিউ করতে গিয়ে দেখা গেছে, ১৮ হাজার টাকার বাজেট ১৮ লাখে উন্নীত করা হয়েছে। এসব প্রজেক্ট ঋণের টাকায় করা হয়েছে। এসব ঋণের চাপ আমাদের ও আগামী প্রজন্মের ওপর পড়েছে। বিভিন্ন চ্যানেলে এসব টাকা পাচার হয়েছে। সেগুলো কীভাবে ফেরত আনা যায়, তা নিয়ে কাজ করতে হবে।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সাবেক সরকারকে সমর্থন দেওয়া আমলাতন্ত্রের গঠনমূলক পরিবর্তন ছাড়া ভবিষ্যতে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই নাজুক অবস্থার মধ্যে রয়েছে মন্তব্য করে এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘গত ৩৪ বছরের ব্যবসা জীবনে বাংলাদেশের ব্যবসায় এমন টানাপোড়েন কোনোদিন দেখিনি। এ অবস্থা চলতে থাকলে বিনিয়োেগ অন্য দেশে চলে যাবে। আমাদের প্রোডাকটিভিটি বাড়াতে হবে, বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম কমানো প্রয়োজন’।


