প্রথম আলোর সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাতকার – আমাদের আকাঙ্ক্ষা তো গণক্ষমতাতন্ত্র, সেভাবে আমরা একটা গণক্ষমতাতান্ত্রিক সংবিধান চাই। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের দাবি ছিল সংবিধানে স্বৈরতন্ত্রের যে ‘প্রাণভোমরা’ আছে, তাকে সরিয়ে ফেলা, যাতে ভবিষ্যতে সংবিধানকে ব্যবহার করে কেউ স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে না পারে। আমরা বহু আগে থেকে ‘৭২-এর সংবিধান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি স্বৈরতন্ত্রের প্রাণভোমরা হলো, সংবিধানের জবাবদিহিহীন এককেন্দ্রিক ক্ষমতাকাঠামো। এ মুহূর্তে আমরা প্রধানত এই ক্ষমতাকাঠামো অংশটার পরিবর্তন সহজ এবং সম্ভব বলে মনে করছি, তাই এটুকুই চাইছি।
এটা ব্যাপক এবং মৌলিক ধরনের পরিবর্তন, যা সংবিধান সংশোধনের প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক বিস্তৃত; কিন্তু বিদ্যমান সবকিছু বাতিল করে সম্পূর্ণ নতুনভাবে তৈরি করা নয়। আমরা ক্ষমতাকাঠামোর এ মৌলিক পরিবর্তনটাকেই সংস্কার বলছি। … রাজনৈতিক দল, অদলীয় সংগঠন, শ্রেণি, পেশা, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, অঞ্চলভেদে যত ধরনের সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান আছে, তারা সংবিধানের কী ধরনের পরিবর্তন চায়, সে মতামত কমিশন সংগ্রহ করতে পারে। সংগৃহীত মতামত থেকে ন্যূনতম ঐকমত্য আছে, এমন পরামর্শগুলোকে এক ভাগে এবং অন্য পরামর্শগুলোকে অন্য ভাগে সংকলিত করতে পারে।
আমাদের চাওয়া হলো ঐকমত্য আছে, এমন পয়েন্টগুলোকে আপাতত ‘সংস্কারের রূপরেখা’ হিসেবে গ্রহণ করা। এই রূপরেখা কীভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে, সে পদ্ধতি বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরির উদ্যোগ নিতে পারে কমিশন। … আমাদের সংবিধান মোটাদাগে দুই অংশে বিভক্ত; একটা নীতি বা আদর্শগত অংশ, আরেকটা প্রায়োগিক বা ক্ষমতাকাঠামোগত অংশ। আমাদের সংবিধানের নীতিগত বা আদর্শগত অংশটার প্রায়োগিক বা ব্যবহারিক প্রযোজ্যতা নেই। কিন্তু সংবিধান প্রশ্নে আমাদের যত তর্কবিতর্ক তার সিংহভাগ এই অংশটা নিয়েই।
আমাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যেহেতু মতাদর্শনির্ভর, তাই তারা সংবিধানে নিজেদের দলীয় মতাদর্শের প্রতিফলন দেখতে চায় এবং স্বাভাবিকভাবেই এখানেই তাদের প্রধান মনোযোগ নিবদ্ধ থাকে। সংবিধানের ব্যবহারিক বা ফাংশনাল দিকটা নিয়ে আমাদের আলোচনা বা তর্কবিতর্ক প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। কিন্তু নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় দুর্ভোগ থেকে মুক্ত এবং তাদের মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে সংবিধানের এই ব্যবহারিক অংশটার প্রতি অধিক মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। …তাহলে ঐকমত্যের পথ বের করাটা সহজ হবে। এদিকে মনোযোগ দিলে সমস্যাটা কমতে পারে, অন্যথায় আমাদের ঐক্য ভেঙে পড়তে পারে।
… আমরা মনে করি, কমিশনের কাজ হলো সবার মতামত সংগ্রহ করে তার থেকে ‘ন্যূনতম ঐকমত্য’ চিহ্নিত করা এবং এটাকে ‘সংস্কারের রূপরেখা’ হিসেবে উত্থাপন করা। আর অন্য প্রস্তাবগুলোকে আকাঙ্ক্ষা হিসেবে লিপিবদ্ধ রাখা। সরকারসহ সবার উচিত হবে ন্যূনতম ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত রূপরেখা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সীমিত সময়ের জন্য ‘সংস্কার সভা’র একটা নির্বাচন করা এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংস্কার সম্পন্ন করা। এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে বলে আমরা মনে করি। গণভোটও একটি পদ্ধতি হতে পারে, কিন্তু তাতে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি থেকে যাবে।


