গত কয়েক বছরে দেশে যুব জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরুটা হয় সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গণঅভ্যুত্থান থেকে। এরপর শোভন কর্মসংস্থান ও যুবদের আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর জাতীয় মনোযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। তথ্য-প্রমাণ নির্দেশ করে বাংলাদেশের যুবদের জন্য কর্মসংস্থান অত্যন্ত সীমিত ও সংকটপূর্ণ।
দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি, যার মধ্যে ১৫–২৯ বছর বয়সী যুবের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ, মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশের বেশি। এই বিশাল জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য মূল চালিকাশক্তি হতে পারে, যদি তারা সঠিক ক্যারিয়ার গাইডেন্স, উদ্ভাবনী উদ্যোগ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, কিন্তু তাদের অধিকাংশের দক্ষতা বাজার-উপযোগী নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের মধ্যে সংযোগহীনতার কারণে এই সমস্যা তীব্র হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারত্বের হার প্রায় ৩.৫ শতাংশ, কিন্তু যুব বেকারত্ব ৭.২ শতাংশ, এই সংখ্যা জাতীয় গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। মোট প্রায় ১ কোটি ৯৪ লাখ তরুণ বেকার। শহরাঞ্চলে বেকারত্ব গ্রামাঞ্চলের তুলনায় বেশি এবং শহরে নারী যুবদের বেকারত্ব পুরুষদের তুলনায় বেশি। এছাড়া অপ্রতুল কর্মসংস্থান ও নিট (NEET—Not in Education, Employment or Training) জনগোষ্ঠীর হারও বাড়ছে। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ অপ্রতুল কর্মসংস্থানে এবং তাদের ৬০ শতাংশের বয়স ১৫–২৯ বছরের মধ্যে। ৩০.৯ শতাংশ তরুণ বর্তমানে নিট-এর মধ্যে, যার একটি বড় অংশ নারী।
শিক্ষিত বেকারত্বও উদ্বেগজনক। প্রতি বছর প্রায় ৯ লাখ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা সম্পন্নদের মধ্যে বেকারত্ব ১২ শতাংশ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভূক্ত কলেজের গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে মাত্র ২১ শতাংশ চাকরি পায় এবং ৬৬ শতাংশ ৩ বছর পর্যন্ত বেকার থাকে। বিশেষত মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেকারত্ব বেশি, কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাপ্ত দক্ষতা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে মেলে না। সফট স্কিলস যেমন কমিউনিকেশন, নেতৃত্ব ও ভাষা দক্ষতাও অনেকের মধ্যে অপর্যাপ্ত।
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি, অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিশ্বায়নের প্রভাবে চাকরির ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ২০২৫–২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল দক্ষতায় ১৭ কোটি নতুন চাকরির সম্ভাবনা থাকলেও, পুনরাবৃত্তিমূলক, ম্যানুয়াল ও প্রশাসনিক পেশায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশেও ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, রিমোট কাজসহ নতুন পেশায় যুবদের সুযোগ দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
তবে দেশীয় কর্মসংস্থান ব্যবস্থা এখনও অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিনিয়োগের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ফলে নতুন চাকরির সৃষ্টি সীমিত। যুব কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। নারী ও বেকার যুবদের জন্য স্বল্পমেয়াদে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ, মধ্যমেয়াদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের সংযোগ বাড়ানো, কারিকুলাম আধুনিকায়ন, ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেনটিসশীপ প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন। দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষানীতি, দক্ষতা উন্নয়ন নীতি এবং শিল্পনীতির কার্যকর বাস্তবায়ন ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক নীতি ও কার্যক্রম গ্রহণ করলে বাংলাদেশ তার যুব জনমিতির সুফল উপভোগ করতে পারবে এবং যুব জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।


