বৃদ্ধি পেয়েছে হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানি, প্রধান গন্তব্য ভারত ও চীন

টানা দুই বছরের পতনের পর গত অর্থবছরে বাংলাদেশের হিমায়িত মাছ রপ্তানি খাত পুনরায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৮৮.৭ মিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৩২৫.৭৩ মিলিয়নের তুলনায় ১৯.৩৩ শতাংশ বেশি। উন্নত কমপ্লায়েন্স ও মান নিয়ন্ত্রণ জোরদারের ফলে এই সাফল্য এসেছে। ভারত ও চীনের চাহিদা বৃদ্ধি খাতের পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তারিকুল ইসলাম জহির বলেন, রপ্তানিকারকরা নতুন কমপ্লায়েন্স শর্তের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিয়েছেন। ট্রেসেবিলিটি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং রোগব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার উন্নতি ইতোমধ্যেই ফল দিচ্ছে।

তবে অনুকূল আবহাওয়ার অভাব, নদী-খালের পলি জমে যাওয়া এবং চিংড়ি চাষে প্রয়োজনীয় লবণাক্ত পানি ব্যবহারে পরিবেশবাদীদের আপত্তির কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিংড়ি উৎপাদন কমে গেছে।

ইপিবি তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ২৩,২৩৮ টন হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি করে ২৯৬.২৯ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা পরিমাণে ২১.৫ শতাংশ এবং মূল্যে ১৯.৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতি কিলোগ্রাম চিংড়ির গড় রপ্তানি মূল্য সামান্য কমে ১২.৭৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে হিমায়িত মাছের রপ্তানি মূল্য ৯২.৪১ মিলিয়ন ডলারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে রপ্তানির পরিমাণ ৭,৯৫১ টনে কমেছে। প্রতি কিলোগ্রাম মাছের গড় মূল্য বেড়ে ১১.৬২ ডলারে উঠেছে, যা বৈশ্বিক বাজারে উচ্চমূল্যের প্রজাতির চাহিদা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, মহামারিজনিত বিপর্যয় এবং ‘আর্লি মরটালিটি সিনড্রোম’-এর মতো রোগে খুলনা ও সাতক্ষীরার চিংড়ি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি কমে ২০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছিল, পরের বছর প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায়।

চিংড়ি রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার এখন চীন, যা ৫৬.৬৯ মিলিয়ন ডলারের চিংড়ি আমদানি করেছে। নেদারল্যান্ডস ৪৭.৩৯ মিলিয়ন এবং যুক্তরাজ্য ৪৪.৯৬ মিলিয়ন ডলারের চিংড়ি আমদানি করেছে। হিমায়িত মাছের ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান শীর্ষে, ৬২.৫৪ মিলিয়ন ডলার।

তবে খাতের চ্যালেঞ্জও কম নয়। উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, পানিদূষণ, মানসম্মত ব্রুডস্টক অভাব, রোগব্যাধি এবং দুর্বল জৈব-নিরাপত্তা ব্যবস্থা সমস্যার মুখোমুখি। বর্তমানে দেশে ১১০টি মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার মধ্যে মাত্র ৩০–৪০টি সক্রিয়, পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে মাত্র ১০টি। খামার পর্যায়ে উৎপাদন বাড়ানো না গেলে অচল কারখানাগুলো চালু করা কঠিন হবে।

চট্টগ্রামভিত্তিক রপ্তানিকারক দোদুল কুমার দত্ত বলেন, “সংখ্যায় ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত আছে, তবে উন্নত হ্যাচারি ব্যবস্থাপনা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ এবং কোল্ড-চেইন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করতে হবে।”

বাংলাদেশের হিমায়িত মাছ খাতের পুনরুদ্ধার উপকূলীয় অর্থনীতিতে স্বস্তি এনেছে, বিশেষত খামার বন্ধ হওয়া এবং রপ্তানিতে ধীরগতির প্রভাব কাটাতে। তবে খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে আরও বিনিয়োগ ও আধুনিকায়নের প্রয়োজন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন