যুক্তরাষ্ট্র–চীনের বাণিজ্যযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু বিরল খনিজ ধাতু

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ নতুন মোড় নিয়েছে, এবার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিরল খনিজ ধাতু। মোট ১৭টি উপাদানকে অন্তর্ভুক্ত করে চীন সম্প্রতি বিরল ধাতুর রপ্তানিতে নতুন কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন এবং এমনকি এশিয়া সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং-এর সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকও বাতিল করার কথা বলেছেন।

বিরল ধাতু বলতে বোঝানো হয় পর্যায় সারণির ১৭টি ধাতব উপাদান, যেমন স্ক্যান্ডিয়াম, ইট্রিয়াম এবং ল্যানথানাইড সিরিজ। ভূগর্ভে এ ধাতুর উপস্থিতি কম নয়, কিন্তু আহরণ ও পরিশোধন ব্যয়সাপেক্ষ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এই ধাতুগুলো ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি কল্পনাই করা যায় না। স্মার্টফোন, এলইডি বাতি, উইন্ড টারবাইন, টেলিভিশনের পর্দা, ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি, এমআরআই মেশিন ও ক্যানসার চিকিৎসায় এগুলোর ব্যবহার অপরিহার্য।

বিশেষভাবে সামরিক শিল্পে বিরল ধাতুর গুরুত্ব অপরিসীম। সিএসআইএসের ২০২৫ সালের গবেষণা অনুযায়ী, এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন, লেজার ও স্যাটেলাইটে এ ধাতুর ব্যবহার রয়েছে। আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট উত্তোলিত বিরল ধাতুর ৬১ শতাংশ আসে চীন থেকে, আর পরিশোধন পর্যায়ে চীনের অংশ ৯২ শতাংশ।

চীনের এই নিয়ন্ত্রণকে মার্কিন বিশ্লেষকরা কৌশলগতভাবে ব্যবহৃত ‘অস্ত্র’ হিসেবে দেখছেন। চীন তুলনামূলকভাবে দাম কম রাখে এবং নতুন প্রতিযোগীদের বাজারে আসা নিরুৎসাহিত করে। ১৯৯০-এর দশক থেকে দেশটি ধাতুর উৎপাদন বাড়িয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে শিল্পটি আনা হয়েছে এবং দুটি বৃহৎ কোম্পানি—চায়না নর্দার্ন রেয়ার আর্থ ও চায়না রেয়ার আর্থ গ্রুপ—সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা হুমকির পর চীনের নতুন তালিকায় আরও পাঁচটি উপাদান যোগ করা হয়েছে—হলমিয়াম, আরবিয়াম, থুলিয়াম, ইউরোপিয়াম ও ইটারবিয়াম। এই ধাতু ও প্রযুক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে এখন অনুমতিপত্র বাধ্যতামূলক। ট্রাম্প বলেন, “চীন প্রতিটি উপাদানে একচেটিয়া দখল নিতে চায়, অথচ আমাদের বিকল্প রয়েছে।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই লড়াই কেবল বাণিজ্য সীমিত নয়, এটি প্রযুক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং শিল্প স্বনির্ভরতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। বিরল ধাতু এখন কেবল প্রযুক্তি উপাদান নয়, বরং অর্থনৈতিক প্রভাব, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যের নতুন কেন্দ্রবিন্দু। চীনের নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করছে, এ বিষয় ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তি লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পালন করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন