মহাবিশ্বের বিস্তৃতি এবং এর রহস্যময় উপাদান ডার্ক ম্যাটার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে ধাঁধা সৃষ্টি হয়েছে, তা সমাধানে নতুন এক সাহসী তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে বিজ্ঞান। প্রথাগত মহাজাগতিক মডেলে একটি জটিল অসঙ্গতি রয়েছে: মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার নিয়ে নিকটবর্তী ও আদিম মহাজাগতিক পরিমাপগুলির মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। এই অসঙ্গতি হাবল টেনশন (Hubble Tension) নামে পরিচিত ও অমীমাংসিত। সাম্প্রতিক এক গবেষণায়, বিজ্ঞানীরা প্রস্তাব করেছেন যে এই সমস্যার সমাধান হয়তো লুকিয়ে আছে এক পরিবর্তনশীল ডার্ক ম্যাটারে।
স্ট্যান্ডার্ড কসমোলজিক্যাল মডেলে হাবল টেনশন একটি জেদি সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণগুলি স্পষ্ট করে যে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু আদিম মহাবিশ্ব থেকে প্রাপ্ত পরিমাপ অনুযায়ী সম্প্রসারণের হার এবং নিকটবর্তী পরিমাপ অনুযায়ী বর্তমানের সম্প্রসারণের হার এক নয়। অর্থাৎ বর্তমান মহাবিশ্ব যেন অতীত অনুমানের চেয়ে দ্রুত গতিতে প্রসারিত হচ্ছে।
এই সমস্যা সমাধানে অনেক ধারণার জন্ম হয়েছে—যেমন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা অসম্পূর্ণ হতে পারে, ডার্ক ম্যাটার হয়তো আদৌ নেই, কিংবা সময়ের প্রবাহ হয়তো অভিন্ন নয়। কিন্তু ক্সিংগাং চেন এবং আব্রাহাম লোয়েবের সাম্প্রতিক কাজ একটি নতুন পথের সন্ধান দেয়, ডার্ক ম্যাটার সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে!
ডার্ক এনার্জির বিবর্তন নিয়ে মডেল তৈরি হলেও, ডার্ক ম্যাটার নিজে যে সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে—এই ধারণাকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর প্রধান কারণ দুটি:
* ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি নিয়ে পর্যবেক্ষণগত প্রমাণ খুবই জোরালো। এটি এমন একটি পদার্থ যা আলোর সাথে খুব কম মিথস্ক্রিয়া করে। এর দুর্বলতা শুধু একটাই—এখনও পর্যন্ত ডার্ক ম্যাটারের কোনো কণার প্রত্যক্ষ শনাক্তকরণ সম্ভব হয়নি।
* ডার্ক ম্যাটারের সমালোচকরা প্রায়শই একে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে চান এবং সংশোধিত মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্বের (Modified Gravity) মাধ্যমে এর প্রভাব ব্যাখ্যা করতে চান। তাদের কাছে ডার্ক ম্যাটার একটি সংশোধনযোগ্য ধারণা নয়, বরং বর্জনীয় একটি ভিত্তি।
ঠিক এই কারণেই পরিবর্তনশীল ডার্ক ম্যাটারের প্রস্তাবনাটি কৌতূহলোদ্দীপক। চেন এবং লোয়েব দেখেন যে, ডার্ক এনার্জি এবং ডার্ক ম্যাটারের বিবর্তন নিয়ে তৈরি মডেল দুটি কিছুটা সম্পর্কযুক্ত। যেহেতু মহাবিশ্বের বিবর্তন আংশিকভাবে শক্তি ঘনত্ব এবং পদার্থ ঘনত্বের অনুপাতের উপর নির্ভর করে, তাই স্থির ডার্ক ম্যাটার ও পরিবর্তনশীল ডার্ক এনার্জির মডেলটি স্থির ডার্ক এনার্জি ও পরিবর্তনশীল ডার্ক ম্যাটারের মডেলের মতোই প্রতীয়মান হতে পারে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবর্তনশীল ডার্ক ম্যাটারের মডেলটি পর্যবেক্ষণগত ডেটার সাথে আরও ভালোভাবে খাপ খায়।
এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এক ধরনের Exotic Dark Matter-এর ধারণা অন্বেষণ করেন, যার অবস্থার সমীকরণ পরিবর্তনশীল। পর্যবেক্ষণগত ডেটার সাথে মেলে এমন একটি মডেল পেতে হলে, ডার্ক ম্যাটারের EOS-কে সময়ের সাথে সাথে দোলিত হতে হবে।
এই ধারণাটি কিন্তু সম্পূর্ণ উদ্ভট নয়। যেমন নিউট্রিনো (Neutrinos) কণার ভর আছে এবং তারা আলোর সাথে দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে। যদিও তারা মহাবিশ্বের সমস্ত ডার্ক ম্যাটারের জন্য দায়ী নয়, তারা হলো উষ্ণ ডার্ক ম্যাটারের একটি রূপ এবং তারা ভর দোলনের মধ্য দিয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, শীতল ডার্ক ম্যাটার কণাগুলির ক্ষেত্রেও হয়তো একই ধরনের দোলন প্রভাব দেখা যায়।
গবেষকদের মতে, পর্যবেক্ষণগত ডেটার সাথে সবচেয়ে ভালোভাবে মিলে যায় এমন মডেলটি হলো এমন একটি মহাবিশ্ব, যেখানে প্রায় ১৫% শীতল ডার্ক ম্যাটার হলো দোলক প্রকৃতির এবং বাকি ৮৫% হলো স্ট্যান্ডার্ড ডার্ক ম্যাটার। এই মিশ্র মডেলটি একইসাথে আমাদের কাছে থাকা ডার্ক ম্যাটার পর্যবেক্ষণগুলির সাথেও সামঞ্জস্য বজায় রাখবে এবং হাবল টেনশনকেও ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হবে।
গবেষকরা তাদের কাজটিকে একটি ‘টয় মডেল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ হলো, এটি একটি বিস্তৃত ধারণা, যা ডার্ক ম্যাটার কণাগুলির জন্য নির্দিষ্ট কোনো কঠোর সীমাবদ্ধতা বা প্যারামিটার নির্ধারণ করে না। তবুও এই কাজ ডার্ক ম্যাটার মডেলগুলির বিস্তৃত পরিসরের দিকে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মহাজাগতিক রহস্য সমাধানে চিরায়ত ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনাগুলি অন্বেষণ করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।


