দক্ষিণ এশিয়ার শতকোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার উৎস গঙ্গা এখন মৃত্যুর পথে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইতিহাসে কখনও গঙ্গার এমন দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া দেখা যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বর্ষা, অতিরিক্ত পানি উত্তোলন ও নদী বাঁধার ফলে এই মহার্ঘ নদী আজ ধ্বংসের মুখে।
হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত গঙ্গা অববাহিকা ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল, যেখানে বসবাস করে ৬৫০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ। ভারতের এক-চতুর্থাংশ মিঠাপানির যোগান এবং কৃষি-অর্থনীতির বড় অংশ এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে—গত এক হাজার তিনশ বছরের ইতিহাসে গঙ্গা অববাহিকার সবচেয়ে ভয়াবহ খরার ঘটনাগুলো ঘটছে গত কয়েক দশকেই। এই পরিবর্তন প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
যে নদী একসময় সারা বছর নাব্য ছিল, এখন গ্রীষ্মে শুকিয়ে যায়। বাংলার নদীবন্দর থেকে বিহার, বারাণসি বা আলাহাবাদ পর্যন্ত যে নৌযান চলাচল ছিল একসময়, এখন সেই পথ নাব্যতার অভাবে অচল। সেচনালার পানিও এখন আগেভাগেই শুকিয়ে যায়, অনেক নলকূপ যা দশকের পর দশক পানি সরবরাহ করেছিল, এখন কেবল ঝরঝরে ধারা দেয়।
বিশ্বের বহু বড় নদীর পরিবর্তন বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, তবে গঙ্গার পরিবর্তনের গতি ও ব্যাপ্তি একেবারেই ব্যতিক্রম। জলবায়ু পরিবর্তনের মডেলগুলোও এই শুষ্কতার মাত্রা অনুমান করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় পরিবেশগত পরিবর্তন এমনভাবে মিশে যাচ্ছে যা আমরা এখনো সম্পূর্ণভাবে বুঝে উঠতে পারিনি।
নদীর পানি বিপুল পরিমাণে সেচে ব্যবহৃত হচ্ছে, কৃষিকাজের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি তোলা হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নদীর তীরে ক্রমে বেড়েই চলেছে। ইতিমধ্যেই এক হাজারেরও বেশি বাঁধ ও ব্যারেজ গঙ্গার প্রাকৃতিক প্রবাহ পরিবর্তন করে দিয়েছে। একই সঙ্গে ক্রমবিকৃত মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন নদীটিকে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না।
হিমালয়ের উঁচুতে গঙ্গার উৎস গঙ্গোত্রী হিমবাহ গত দুই দশকে প্রায় এক কিলোমিটার পেছনে সরে গেছে। এই গলন একদিকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভূগর্ভস্থ পানির সংকট। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা বিশ্বের দ্রুততম হারে শূন্য হয়ে যাওয়া জলাধারগুলোর একটি, যেখানে প্রতি বছর পানির স্তর ১৫ থেকে ২০ মিলিমিটার নেমে যাচ্ছে। তাছাড়া এই পানির বড় অংশই আর্সেনিক ও ফ্লোরাইডে দূষিত, যা মানুষের স্বাস্থ্য ও কৃষিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
মানব প্রকৌশলও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজ শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের দিকে পানিপ্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে, ফলে ভূমি লবণাক্ত হচ্ছে এবং সুন্দরবনের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। উত্তর বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অনেক ছোট নদী ইতিমধ্যেই গ্রীষ্মে শুকিয়ে যাচ্ছে যা ভবিষ্যতে বৃহত্তর বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে কয়েক দশকের মধ্যেই কোটি কোটি মানুষ খাদ্য ও পানির ভয়াবহ সংকটে পড়বে। তাই এখন প্রয়োজন সমন্বিত ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পদক্ষেপ ভূগর্ভস্থ পানির অতি-ব্যবহার কমানো, নদীতে ন্যূনতম প্রবাহ বজায় রাখা এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবীয় প্রভাব একসাথে বিবেচনায় নিয়ে নতুন জলনীতির রূপরেখা তৈরি করা।
গঙ্গা কেবল দক্ষিণ এশিয়ার সভ্যতার প্রাণরেখা, পবিত্রতার প্রতীক এবং কোটি মানুষের অস্তিত্বের ভিত্তি। কিন্তু এই নদী দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে, যেন গঙ্গা আগামী প্রজন্মের জন্যও প্রবাহিত থাকে।


