জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী উপকূলীয় অঞ্চলে দৃশ্যমান হচ্ছে। তাপমাত্রার পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের অনিয়ম এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে মাটির নীচে থাকা পানিতে এবং নদী-নালা সহ অন্যান্য পানিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করছে। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র মানুষের পানীয় ও চাষযোগ্য জমি নয়, মিঠা জলের জলজ উদ্ভিদদের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষণায় মিঠা জলের জনপ্রিয় জলজ উদ্ভিদ যেমন পানিফুল (Water Hyacinth, Eichhornia crassipes), ভেলফুল (Buffalo Spinach, Enhydra fluctuans) এবং কচু (Taro, Colocasia esculenta)-এর বৈশিষ্ট্যগুলোতে লবণাক্ত পানির প্রভাব পরীক্ষা করা হয়েছে।
উদ্ভিদগুলোকে ০, ১০, ২০ এবং ৩০ পিপিটি (ppt) লবণাক্ত পানিতে ৪৮ ঘণ্টা ধরে রাখা হয়। এই সময়কালে উদ্ভিদের জৈব ভরের পরিবর্তন, স্টোমাটা (পাতার পোর) ঘনত্ব, পানির বাষ্পীভবন হার, ক্লোরোফিলের পরিমাণ, আপেক্ষিক জল ধারণ ক্ষমতা এবং টিস্যুর আকারগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, লবণাক্ততা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভিদের জৈব ভর, স্টোমাটা ঘনত্ব এবং আপেক্ষিক জল ধারণ ক্ষমতা কমেছে।বিশেষভাবে দেখা গেছে যে কচু অন্যান্য উদ্ভিদের তুলনায় লবণ সহনশীলতার ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। স্টোমাটার সংকোচন এবং জলীয় হার কমার কারণে উদ্ভিদের সাধারণ শ্বাসক্রিয়া প্রভাবিত হয়েছে। হিষ্টোলজিক্যাল পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, লবণাক্ত চাপের কারণে মূল এবং টিউবার টিস্যুতে বিকৃতি দেখা দিয়েছে, যা উদ্ভিদের স্বাস্থ্য এবং বৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, এই ফলাফলগুলি শুধুমাত্র উপকূলীয় মিঠা জলের উদ্ভিদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা তুলে ধরছে না, বরং জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যহীনতার সম্ভাবনাও নির্দেশ করছে।
লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে জলজ উদ্ভিদদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হলে, মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর জীবনচক্রেও প্রভাব পড়বে। উপকূলীয় অঞ্চলে মানুষের খাদ্য ও জীবিকা নির্বাহের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষণার মূল বার্তাটি হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত লবণাক্ততার বৃদ্ধি কেবল মাটির উর্বরতা ও কৃষির জন্যই হুমকি নয়, মিঠা জলের পরিবেশ এবং জলজ বাস্তুতন্ত্রের জন্যও গুরুতর প্রভাব ফেলে। তাই বিজ্ঞানীরা এই ধরনের পরিবেশগত চাপ মোকাবিলায় লবণ সহনশীল উদ্ভিদ চাষ, জল ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণের গুরুত্বের ওপর জোর দিচ্ছেন।


