ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় টানা দুই বছরের নৃশংস ইসরায়েলি হামলার পর অবশেষে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। মিসরের পর্যটন শহর শারম আল শেখে হামাস ও ইসরায়েল দীর্ঘ আলোচনার পর এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। শুক্রবার ভোরে চুক্তি অনুমোদন দেয় ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা, এবং দুপুর ১২টা (বাংলাদেশ সময় বেলা তিনটা) থেকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাজার নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনারা প্রত্যাহার করবেন। এছাড়া ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গাজায় বন্দী থাকা সকল জীবিত জিম্মি হামাসকে ফিরিয়ে দিতে হবে। এর পাশাপাশি ইসরায়েলের বিভিন্ন কারাগারে থাকা প্রায় ১,৯৫০ জন ফিলিস্তিনি বন্দীও ধাপে ধাপে মুক্তি পাবেন। বন্দীদের মধ্যে ২৫০ জন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত; এদের মধ্যে ১৫৯ জন ফাতাহ, ৬৩ জন হামাস, ১৬ জন ইসলামিক জিহাদ এবং ১২ জন পিএলএফপি-র সদস্য।
ফিলিস্তিনি নাগরিকরা যুদ্ধবিরতির খবরে ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবির থেকে গাজা নগরীর দিকে ফিরছিলেন মানুষ। মেহেদি সাকলা নামের এক ফিলিস্তিনি বলেন, “জানি সব বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গেছে, তবু ফিরে যেতে পেরে আমরা খুশি। দুই বছরের পালানো জীবন আমাদের জন্য সহজ ছিল না।”
গাজার কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরে ইসরায়েলের হামলায় ৪ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি বা ৯২ শতাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে। স্কুল ধ্বংস হয়েছে ৫১৮টি, শিক্ষাবঞ্চিত হয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার শিক্ষার্থী। ৬৫৪টি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষিজমির মাত্র দেড় শতাংশ চাষযোগ্য রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে সেনাদের প্রত্যাহারের পরও গাজার আকাশে কিছু সময় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান এবং হেলিকপ্টারের উপস্থিতি দেখা গেছে।দক্ষিণ গাজায় ট্যাংক ও কামানের গোলার শব্দও শোনা গেছে, যা কিছু ফিলিস্তিনিকে উত্তরের দিকে বাড়ি ফিরতে ভয় দেখিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা ‘শান্তি পরিকল্পনার’ প্রথম ধাপ হিসেবে এই যুদ্ধবিরতি দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনার অনুযায়ী তিন ধাপে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনারা প্রত্যাহার করবেন। প্রথম ধাপে ৫৩ শতাংশ এলাকা, দ্বিতীয় ধাপে ৪০ শতাংশ এলাকা এবং শেষ ধাপে ১৫ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। শেষ ধাপের পর ‘নিরাপত্তা গণ্ডি’ স্থাপন করা হবে, যেখানে সেনারা হুমকি পুরোপুরি কাটানো না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান করবেন।
ফিলিস্তিনি বন্দীদের তালিকা প্রকাশ করেছে ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতির ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ২০ জন জীবিত জিম্মি হামাসকে মুক্তি দিতে হবে, কিন্তু মৃত জিম্মিদের মরদেহ ফেরত দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট করা হয়নি।
এদিকে গাজার পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তার জন্য চুক্তির আওতায় প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। জাতিসংঘের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ১ লাখ ৭০ হাজার টন ত্রাণ মিসর ও জর্ডানে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
গাজায় যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কাতার, তুরস্কসহ বিভিন্ন আরব ও মুসলিম দেশের সেনারা যুক্ত থাকবেন। তবে কোনো মার্কিন সেনা গাজায় প্রবেশ করবেন না। তারা যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ ও ত্রাণ প্রবেশে সহায়তা করবেন। বন্দিবিনিময় শেষ হলে নিরাপত্তার জন্য আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠন করা হবে।
তবে যুদ্ধবিরতির সঙ্গে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটসঙ্গীরা হামাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল না করলে সরকার পতনের হুমকি দিয়েছেন। হামাসনিয়ন্ত্রিত গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেনা প্রত্যাহারের এলাকা নিরাপত্তার জন্য বাহিনী মোতায়েন করা হবে, তবে সেখানে হামাসের সদস্য থাকবেন কি না তা উল্লেখ করা হয়নি।
প্যালেস্টেনিয়ান লিবারেশন অর্গানাইজেশনের সাবেক সদস্য হানান আশরাউই মনে করেন, যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ শেষ হলেও ‘আসল চ্যালেঞ্জগুলো’ শুরু হবে। এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে গাজা পুনর্গঠন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও ফিলিস্তিনি ঐক্য নিশ্চিত করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, পশ্চিম তীরের দখলদারি বন্ধ না করা পর্যন্ত প্রকৃত শান্তি স্থাপিত হবে না। গাজায় যুদ্ধবিরতির খবরে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা বাড়িঘরে ফিরলেও ধ্বংসস্তূপ, শিক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিপর্যয় মোকাবেলায় এখনও কঠোর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও ত্রাণ প্রবেশের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে পুনর্গঠন শুরু হবে।


