চিকিৎসা বিজ্ঞানে নিউক্লিয়ার মেডিসিন কৌশল এসপিইসিটি স্ক্যান, হৃৎপিণ্ডের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ, রক্ত প্রবাহের ধরণ অনুসরণ এবং শরীরের গভীরে লুকিয়ে থাকা রোগ নির্ণয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই কৌশলটি অদৃশ্য ক্যামেরার মতো কাজ করে, যেখানে রোগীর শরীরে একটি স্বল্প-জীবিত তেজস্ক্রিয় ট্রেসার (radiotracer) প্রবেশ করানো হয়। ট্রেসারটি গামা রশ্মি নির্গত করে, যা টিস্যুর মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে এবং শরীরের বাইরে থাকা ডিটেক্টর দ্বারা গৃহীত হয়।
প্রতিটি গামা রশ্মি এক একটি পিক্সেলের মতো কাজ করে এবং লক্ষ লক্ষ পিক্সেল রেকর্ড হওয়ার পর কম্পিউটার সেগুলোকে একত্রিত করে একটি ত্রিমাত্রিক চিত্র তৈরি করে। তবে বর্তমান স্ক্যানারগুলোতে ব্যবহৃত ডিটেক্টরগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং তৈরি করা কঠিন হওয়ায় এর ব্যাপক ব্যবহারকে সীমিত করে রেখেছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য Northwestern University এবং চীনের সুচৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা পেরোভস্কাইট-ভিত্তিক একটি নতুন ডিটেক্টর তৈরি করেছেন, যা নিউক্লিয়ার ইমেজিংকে আরও নির্ভুল সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ করার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
বর্তমানে নিউক্লিয়ার মেডিসিনে ব্যবহৃত ডিটেক্টরগুলো প্রধানত ক্যাডমিয়াম জিঙ্ক টেলুরাইড বা সোডিয়াম আয়োডাইড দিয়ে তৈরি। এই দুটি উপাদানেরই নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ক্যাডমিয়াম জিঙ্ক টেলুরাইড ডিটেক্টরগুলো অসাধারণ রেজোলিউশন প্রদান করলেও এদের প্রধান সমস্যা হলো আকাশছোঁয়া দাম। একটি ক্যামেরার জন্য এর দাম কয়েক লক্ষ থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। উপরন্তু ক্যাডমিয়াম জিঙ্ক টেলুরাইড ক্রিস্টালগুলো ভঙ্গুর হওয়ায় উৎপাদন করা অত্যন্ত কঠিন।
সোডিয়াম আয়োডাইড ডিটেক্টরগুলো ক্যাডমিয়াম জিঙ্ক টেলুরাইড এর চেয়ে সাশ্রয়ী হলেও এর মান অনেক কম। এগুলো আকারে বড় এবং কম নির্ভুল চিত্র তৈরি করে, যা অনেকটা কুয়াশাচ্ছন্ন জানালার মধ্য দিয়ে দেখার মতো। এর ফলে রোগ নির্ণয়ে স্পষ্টতার অভাব দেখা যায়। এই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে বিজ্ঞানীরা নতুন পদার্থের সন্ধান করছিলেন, যেটা উচ্চ মানের ইমেজিং প্রদান করতে পারে এবং একই সাথে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে পারে।
পেরোভস্কাইট হলো এক ধরনের স্ফটিক যা সৌরশক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরের জন্য পরিচিত। এই পদার্থ নিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গবেষণা করছেন অধ্যাপক মার্কুরি কানাতজিডিস। ২০১৩ সালে তাঁর দল প্রথমবারের মতো প্রমাণ করে একক পেরোভস্কাইট স্ফটিক এক্স-রে এবং গামা রশ্মি কার্যকরভাবে শনাক্ত করতে পারে। এই আবিষ্কারটি বিকিরণ শনাক্তকরণ উপাদানের একটি নতুন ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা করে এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার একটি নতুন ঢেউ নিয়ে আসে।
সাম্প্রতিক গবেষণায়, কানাতজিডিস এবং সহযোগী অধ্যাপক ইহুই হে পেরোভস্কাইট ক্রিস্টাল ব্যবহার করে একটি উন্নত গামা-রে ডিটেক্টর তৈরি করেছেন। এই ডিটেক্টরটি একটি পিক্সেলযুক্ত সেন্সরের মতো কাজ করে, যা স্মার্টফোনের ক্যামেরার পিক্সেলের মতোই উচ্চ রেজোলিউশন এবং স্থিতিশীলতা প্রদান করে।
নতুন পেরোভস্কাইট ডিটেক্টরের পারফরম্যান্স পূর্ববর্তী ডিটেক্টরগুলোর চেয়ে অনেক উন্নত। পরীক্ষার সময় এটি বিভিন্ন শক্তির গামা রশ্মিকে অত্যন্ত নির্ভুলতার সাথে আলাদা করতে সক্ষম হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সেরা রেজোলিউশন। এটি অত্যন্ত ক্ষীণ সংকেতও ধরতে পারে, যেমন ক্লিনিকাল চিকিৎসায় ব্যবহৃত টেকনেশিয়াম-99m নামক একটি মেডিকেল রেডিয়োট্রেসার থেকে আসা সংকেত। ডিটেক্টরটি মাত্র কয়েক মিলিমিটার দূরে অবস্থিত ক্ষুদ্র তেজস্ক্রিয় উৎসকেও স্পষ্টভাবে আলাদা করতে পারে, যে ক্ষমতা অত্যন্ত সূক্ষ্ম রোগ নির্ণয়ের জন্য অপরিহার্য।
এই ডিটেক্টরটি স্থিতিশীলতাতেও অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছে, ট্রেসারের প্রায় সমস্ত সংকেত কোনো ক্ষতি বা বিকৃতি ছাড়াই সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। এই উচ্চ সংবেদনশীলতার কারণে রোগীদের স্ক্যানের সময় কমানো এবং রেডিয়েশনের কম মাত্রার সম্মুখীন হওয়া সম্ভব হবে।
এই প্রযুক্তিকে ল্যাব থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্পিনআউট কোম্পানি অ্যাকটিনিয়া ইনকর্পোরেটেড কাজ করছে। যেহেতু পেরোভস্কাইট ক্রিস্টালগুলো সহজে বৃদ্ধি করা যায় এবং এদের উপাদানগুলো সরল, তাই এটি CZT এবং NaI ডিটেক্টরগুলোর চেয়ে অনেক কম খরচে বিকল্প হতে পারে। এর ফলে দরিদ্র দেশ এবং ছোট হাসপাতালগুলোও উন্নত নিউক্লিয়ার ইমেজিং প্রযুক্তির সুবিধা পাবে, যা বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করতে সহায়ক হবে।
পেরোভস্কাইট-ভিত্তিক গামা-রে ডিটেক্টরের উদ্ভাবন নিউক্লিয়ার মেডিসিন এবং ডায়াগনস্টিক ইমেজিংয়ের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি কেবল প্রযুক্তিগত সাফল্যের চেয়েও বেশি কিছু, এটি এমন একটি উদ্ভাবন যা চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও সাশ্রয়ী, দক্ষ এবং নিরাপদ করে তুলবে। এর ফলে অনেক বেশি মানুষ উন্নত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সুবিধার আওতায় আসবে।


