দর্শনশাস্ত্র ও সাহিত্যের মধ্যে একটা অলিখিত সীমানা বহু বছর ধরেই চলে আসছে। আজকের দিনে দর্শনের সিলেবাসে জন লকের মতো চিন্তাবিদকে পাওয়া যায়, কিন্তু জোসেফ অ্যাডিসন এর মতো সাহিত্যিককে নয়। কিন্তু এই বিচ্ছেদ কি সব সময় ছিল? না। স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম ঠিক এই বিচ্ছেদের সূচনাকারী ছিলেন— বিশেষ করে একটি পুরোনো লেখার ধরন, ‘ক্যারেক্টার স্কেচ’ -কে নৈতিক দর্শন বা Moral Philosophy চর্চার একটি বৈধ পদ্ধতি হিসেবে চ্যালেঞ্জ জানানোর মাধ্যমে। ‘ক্যারেক্টার স্কেচ’ হলো একজন ব্যক্তি বা একটি সামাজিক প্রকারের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, যা তাদের অভ্যাসগত পছন্দ ও আচরণের ওপর আলোকপাত করে। যেমন: একজন ‘ইনটেলেকচুয়াল’ বা একজন ‘ম্যানসপ্লেনার’-এর বর্ণনা। এই ধরনটি কেবল বর্ণনামূলক, কিছুটা সমাজতাত্ত্বিক, কিছুটা সাহিত্যিক এবং প্রায়শই হাস্যরসাত্মক। এই সাহিত্যিক ঘরানার ইতিহাস অনেক পুরোনো, প্রাচীন গ্রিস পর্যন্ত বিস্তৃত। থিওফ্রাস্টাস নামের একজন দার্শনিক অ্যারিস্টটলের শিষ্য ছিলেন, তিনি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে ‘দ্য ক্যারেক্টারস’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। এই সংগ্রহে ৩০টি কু-অভ্যাস (Vices) যেমন— ‘খারাপ সময়জ্ঞান’, ‘অন্যমনস্কতা’, ‘অলস আলাপ’ ইত্যাদি— এমন সব চরিত্রের স্কেচ আঁকা হয়েছে যারা এই গুণগুলোর প্রতিমূর্তি। থিওফ্রাস্টাস এমন কোনো নাটকীয় বা মহৎ পাপের প্রতি আগ্রহী ছিলেন না, যেমন— হিংসা বা লালসা । তিনি বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ সামাজিক ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরেছেন। এই স্কেচগুলোর বিশেষত্ব হলো এতে আচরণের কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি, শুধু বর্ণনা করা হয়েছে। থিওফ্রাস্টাসের এই কাজটি নিয়ে বহু শতাব্দী ধরে ক্লাসিকিস্টরা বিতর্ক করেছেন— এটি কি বাগ্মিতার জন্য লেখা, নাকি কমেডি চরিত্রের তালিকা, নাকি নৈতিকতার বই? ১৫শ শতকের রেনেসাঁসের সময় থেকে ইউরোপীয় পণ্ডিতরা এটিকে নৈতিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন। তারা বিশ্বাস করতেন, এই স্কেচগুলো মানুষের খারাপ গুণাবলীকে চিনতে এবং নিজেদের সংশোধন করতে সাহায্য করবে। ফরাসি ফিলোলোজিস্ট আইজ্যাক ক্যাসোবন ১৬শ শতকের শেষে এই ঘরানার প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখান। তাঁর মতে, যুক্তি এবং সাধারণ উপদেশের পাশাপাশি ‘ক্যারেক্টার-রাইটিং’ ছিল নৈতিকতা শেখানোর তৃতীয় এবং সবচেয়ে মার্জিত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে যুক্তির বদলে কোনো কু-অভ্যাসকে একটি জীবন্ত চরিত্রের মাধ্যমে মূর্ত করে দেখানো হয়। এটি দর্শনের মতো নৈতিকতা শেখাত, কিন্তু সাহিত্যের মতো ছিল প্রাণবন্ত। ক্যাসোবনের এই ধারণা পরের শতাব্দীতে দারুণ প্রভাবশালী হয়েছিল। ১৭শ শতকে জোসেফ হল -এর হাত ধরে এটি ইংরেজিতে এবং পরে জঁ দে লা ব্রুইয়েরে -এর মাধ্যমে ফরাসিতে জনপ্রিয় হয়। লা ব্রুইয়েরে তাঁর বেস্ট সেলিং ‘দ্য ক্যারেক্টারস’-এ শুধুমাত্র গুণ-ত্রুটি নয়, বিভিন্ন সামাজিক প্রকারভেদ— যেমন ধনী ও দরিদ্র, কর-সংগ্রাহক, আইনজীবী— এদের বর্ণনাও যোগ করেন। তাঁর স্কেচে সমাজতাত্ত্বিক বিবরণও থাকত।
উদাহরণস্বরূপ ধনী ব্যক্তি ‘তাঁর রুমাল বের করে, নাকে ধরেন, এত জোরে নাক ঝাড়েন যে সবাই শুনতে পায়, রুমে থুথু ফেলেন এবং উচ্চস্বরে হাঁচি দেন।’ দরিদ্র ব্যক্তি এর বিপরীতে ‘টুপি নিচে রেখে নাক ঝাড়েন, রুমালের ভেতরে থুথু ফেলেন এবং কোণে গিয়ে হাঁচি দেন।’ ১৭৪৮ সালে ডেভিড হিউম তাঁর ‘An Enquiry Concerning Human Understanding’ গ্রন্থে এসে এই দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রথাকে ভেঙে দেন। হিউম সমসাময়িক নৈতিক দর্শনকে দুটি প্রধান ধারায় বিভক্ত করেন, সহজ ও স্পষ্ট ও সঠিক ও বিমূর্ত । সহজ ও স্পষ্ট ধারা, যা পাঠকের ‘রুচি ও অনুভূতি’ দ্বারা চালিত হয়। এই ধারার দার্শনিকরা সাহিত্যের আশ্রয় নিয়ে নৈতিকতাকে ‘আকর্ষণীয় রঙে’ আঁকেন। হিউম এই ধারার প্রতিনিধি হিসেবে সিসারো, লা ব্রুইয়েরে এবং অ্যাডিসনকে উল্লেখ করেন। এরা সবাই ‘ক্যারেক্টার স্কেচ’ রচনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হিউম স্বীকার করেন যে এরা চমৎকার স্টাইলিশ লেখক, কিন্তু এরা ‘আসলের মূলে পৌঁছান না’। সঠিক ও বিমূর্ত ধারা নিয়মনীতি ও সাধারণ সূত্র অনুসন্ধানে আগ্রহী। এই ধারার প্রতিনিধিরা হলেন অ্যারিস্টটল, নিকোলাস ম্যালব্রাঞ্চ এবং জন লক। হিউম মনে করেন এই ধারা সত্যের কাছাকাছি হলেও, অত্যন্ত দুর্বোধ্য ও প্রযুক্তিগত হয়ে ওঠে।
হিউমের মতে, কোনো পদ্ধতিই পুরোপুরি সঠিক নয়। তিনি চাইলেন এই দুই ধারার সেরা অংশগুলোকে একত্রিত করতে— ‘গভীর অনুসন্ধান’ ও ‘সত্য’ এবং ‘পরিষ্কারতা’ ও ‘নব্যতা’ । তিনি দর্শনকে অঙ্গ ব্যবচ্ছেদকারী বিজ্ঞানীর ভূমিকার সাথে তুলনা করেন, যিনি শুধু বাহ্যিক রূপ নয়, মানুষের মনের ‘অভ্যন্তরীণ কাঠামো’ ও ‘আসল নীতি’ জানতে চান। এই কাজ করতে গিয়েই হিউম ‘ক্যারেক্টার স্কেচ’-এর মতো বর্ণনামূলক পদ্ধতি হয়ে ওঠে এমন এক অনুসন্ধান যা সাধারণ এবং সর্বজনীন নীতির দিকে ধাবিত হয়। হিউম একই বছর ‘Of National Characters’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন, কিন্তু সেখানেও তিনি থিওফ্রাস্টাসের স্টাইলে ফরাসি বা ইতালীয় মানুষের কোনো স্কেচ আঁকেননি। জাতিগত চরিত্রের কারণ ও তার মূল নীতি অনুসন্ধানে মন দেন, চরিত্র বর্ণনা নয় চরিত্র কেন হয় সেই নীতি নির্ধারণই ছিল তাঁর লক্ষ্য। উল্লেখ্য যে, এই প্রবন্ধে হিউম অত্যন্ত বিতর্কিতভাবে শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে ‘স্বাভাবিকভাবে নিকৃষ্ট’ বলে মন্তব্য করেন, যা জাতিগত বৈষম্যমূলক ধারণার পরিসংখ্যানগত প্রতিফলন ঘটাতে তার আগ্রহ দেখায়। এই চরম নেতিবাচক বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বর্ণবাদমূলক সাধারণীকরণকে সমর্থন করেন, যা তৎকালীন সমাজের কিছু অংশের দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ। হিউমের এই বিভাজনের পর, ‘ক্যারেক্টার স্কেচ’ এবং ‘চিত্রকলাতুল্য’ দর্শন যা প্রাণবন্ত বর্ণনা এবং চরিত্র নির্ভর ছিল তা ধীরে ধীরে ‘সাহিত্য’ নামের সমুদ্রে গিয়ে মিশে যায়। আর নীতি ও সাধারণ নীতি অনুসন্ধানী দর্শন পরিণত হয় আজকের ‘দর্শনশাস্ত্র’-এ। হিউম এভাবে দর্শন ও সাহিত্যের পথকে আলাদা করে দেন।
হিউমের আগের ঐতিহ্যকে মনে রাখলে আমরা দেখতে পাই, সাহিত্যিক ধরনের দর্শনও সম্ভব ছিল— যেখানে জ্ঞান সামাজিক ও প্রাসঙ্গিক এবং যেখানে নান্দনিকতা অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এই পুরোনো ঘরানা আমাদের দুটি বিষয় ভাবতে উৎসাহিত করে. বর্ণনার গুরুত্ব ও খারাপ উদাহরণের মাধ্যমে নৈতিক নির্দেশ, ‘অন্যমনস্কতা’ বা ‘খারাপ সময়জ্ঞান’-এর মতো কোনো সাধারণ ধারণাকে বুঝতে শুধু সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যাই যথেষ্ট নয়, একটি বিশ্বস্ত, প্রাণবন্ত বর্ণনাও দরকার। সাধারণ ধারণাটি বোঝার জন্য আমাদের ‘অন্যমনস্ক মানুষটি’কে দরকার। যখন আমরা ‘ম্যানসপ্লেনার’-এর মতো নৈতিক প্রকারের বর্ণনা করি, তখন আসলে আমরা ‘খারাপ উদাহরণের মাধ্যমে নৈতিক শিক্ষা’ দেওয়ার প্রাচীন ঐতিহ্যেই যুক্ত থাকি। থিওফ্রাস্টাসের স্কেচগুলো যেমন মানুষকে ঐসব কু-অভ্যাস থেকে দূরে থাকতে উৎসাহিত করত, তেমনই ২১শ শতাব্দীতে ‘ম্যানসপ্লেনার’ বলা হয় এই আশায় যে ব্যক্তিটি তার আচরণ পরিবর্তন করবে। রূপান্তরের ওপর এই জোরই থিওফ্রাস্টাসের স্কেচকে স্টেরিওটাইপ বা গতানুগতিক ছক থেকে আলাদা করে তোলে, কারণ এই গুণাবলীকে অপরিহার্য জাতিগত বা নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হতো না বরং পরিবর্তনযোগ্য আচরণ হিসেবে দেখা হতো। থিওফ্রাস্টাসের স্বল্প পরিচিত স্কেচের বইটি আমাদের এই প্রশ্ন করতে শেখায়— সাহিত্য ও দর্শনের মিলন থেকে কি শুধু ‘ভালো লেখার স্টাইল’-এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা যায় না? এই ঐতিহ্য দেখায় যে সাহিত্যের একটি আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ ও উপেক্ষিত অংশও সাধারণ ধারণাকে বোঝার এবং আমাদের আচরণকে সংশোধন করার ক্ষমতা রাখে যা একান্তভাবেই দার্শনিক কাজ।


