আর্নেস্তো চে গুয়েভারা (Ernesto “Che” Guevara), নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বলিষ্ঠ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মুখ—এক স্বপ্নাতুর বিপ্লবী, যিনি পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে ‘তৃতীয় বিশ্ব’-এর শৃঙ্খল মোচনের স্বপ্ন হয়ে উঠেছিলেন। বুর্জোয়া পরিবারে জন্ম নিয়েও চিকিৎসক থেকে গেরিলা কমান্ডার এবং কিউবার রাষ্ট্রনায়ক হওয়া পর্যন্ত চে’র জীবন ছিল একটি চলমান রাজনৈতিক ইশতেহার। তাঁর কর্মজীবন কিউবার বিপ্লব, কঙ্গোর ব্যর্থ অভিযান এবং বলিভিয়ার গহীন জঙ্গলে চূড়ান্ত আত্মত্যাগ—এই তিনটি প্রধান পর্বে বিভক্ত।
আজ তাঁর মৃত্যুদিনে যখন আমরা তাঁকে স্মরণ করি, তখন প্রশ্ন জাগে, কিভাবে এক লাতিন আমেরিকান চিকিৎসক সারা বিশ্বের মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠলেন?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব দু’টি প্রধান ব্লকে বিভক্ত হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লক এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লক। এই সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার সদ্য স্বাধীনতা লাভ করা বা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামরত দেশগুলো পরিচিত ছিল ‘তৃতীয় বিশ্ব’ নামে। এই দেশগুলো একদিকে যেমন পুরাতন ঔপনিবেশিক শক্তির শোষণ থেকে মুক্তি পেতে চাইছিল, তেমনি অন্যদিকে নব-সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত ছিল। চে গেভারা এই শোষিত ও নিপীড়িত মানুষগুলোর কণ্ঠস্বর ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তিনি মনে করতেন, সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে মুক্তি একমাত্র সশস্ত্র বিপ্লব-এর মাধ্যমেই সম্ভব।
১৯২৮ সালে আর্জেন্টিনার রোসারিওতে জন্মগ্রহণকারী আর্নেস্তো গেভারা মূলত একজন পেশাদার চিকিৎসক ছিলেন। ১৯৫১-৫২ সালে ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে তাঁর ঐতিহাসিক মোটরসাইকেল ভ্রমণ তাঁকে মহাদেশের দারিদ্র্য, সামাজিক অবিচার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্পোরেট শোষণের ভয়াবহ চিত্র দেখায়। এই অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তি স্থাপন করে।
১৯৫৬ সালে মেক্সিকোতে তিনি ফিদেল কাস্ত্রো’র সঙ্গে পরিচিত হন এবং কিউবার স্বৈরশাসক বাতিস্তা’র বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে যোগ দেন।কিউবার সিয়েরা মায়েস্ত্রা পর্বতে চে তার চিকিৎসা-জ্ঞান ছেড়ে গেরিলা কৌশল ও সামরিক রণনীতিতে মনোযোগ দেন। তার Guerilla Canon তত্ত্ব কিউবার সফলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামরিক প্রতিভা, ইস্পাত-কঠিন শৃঙ্খলা এবং আদর্শের প্রতি অগাধ বিশ্বাস তাঁকে কাস্ত্রোর দ্বিতীয় প্রধান কমান্ডারে পরিণত করে। ১৯৫৯ সালে কিউবান বিপ্লবের বিজয়ের পর, চে কিউবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান এবং পরে শিল্পমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। এই সময় তিনি কিউবার সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নির্মাণে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত কিউবা গঠনে নেতৃত্ব দেন।
চে বিশ্বাস করতেন, তাঁর বিপ্লব কেবল কিউবার জন্য নয়, সমগ্র তৃতীয় বিশ্বের জন্য। তিনি ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও পদমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বৈশ্বিক সংহতির অংশ হিসেবে ‘বহু ভিয়েতনাম’ তত্ত্বের বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করেন এবং আন্তর্জাতিক বিপ্লবের কৌশলগত পথে অগ্রসর হন।
১৯৬৫ সালে তিনি কিউবা থেকে অদৃশ্য হয়ে যান এবং কঙ্গোর (তখনকার বেলজিয়ান কঙ্গো) গৃহযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি কঙ্গোর মুলেলবাদী গেরিলাদের প্রশিক্ষণ দিতে যান, যাদের লক্ষ্য ছিল পশ্চিমাপন্থী সরকারকে উৎখাত করা। তবে কঙ্গোর ভাষাগত জটিলতা, স্থানীয় নেতা ও গেরিলাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে এই অভিযান ব্যর্থ হয়। এটি চে-এর বিপ্লবী জীবনে প্রথম বড় ধাক্কা ছিল।
কঙ্গো থেকে ফিরে এসে, নিজের পরিচয় গোপন করে চে ১৯৬৬ সালে বলিভিয়ার গহীন জঙ্গলে গেরিলা ঘাঁটি স্থাপন করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল বলিভিয়া থেকে বিপ্লবের আগুন ল্যাটিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়া। তবে বলিভিয়ার অভিযানও সফল হয়নি। স্থানীয় কৃষকদের সমর্থন না পাওয়া, বলিভিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির অসহযোগিতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশিক্ষিত বলিভিয়ান সেনাবাহিনীর তৎপরতার কারণে চে-এর গেরিলা দল দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর বলিভিয়ার লা হিগুয়েরা-তে চে গেভারা তাঁর কয়েকজন সহযোদ্ধা-সহ বলিভিয়ান সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন।আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক আবেদনের তোয়াক্কা না করে, পরের দিন, ৯ অক্টোবর, বলিভিয়ার সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ-এর পরামর্শে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তাঁর মৃত্যু দ্রুতই বিশ্বজুড়ে এক গভীর শোক এবং সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ক্রোধের জন্ম দেয়।
মৃত্যুর পর চে গেভারা কেবল একজন বিপ্লবী নেতা হিসেবেই নয়, রাজনৈতিক শহীদ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে ওঠেন। তাঁর মুখচ্ছবি হয়ে ওঠে স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বৈশ্বিক প্রতীক।
চে গেভারা আজও তৃতীয় বিশ্বের কোটি কোটি শোষিত মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাস ও ক্ষমতা ত্যাগ করে জনগণের মুক্তির জন্য লড়েছেন। একজন মন্ত্রী হয়েও অস্ত্র হাতে জঙ্গলে ফিরে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত আধুনিক রাজনীতিতে বিরল।
তিনি ছিলেন আদর্শের প্রতি অসম্ভব কঠোর এবং নিজের জীবনেও সেই নীতি মেনে চলতেন। তিনি যে “নতুন মানুষ”-এর ধারণা দিয়েছিলেন, তা ব্যক্তিগত লোভের ঊর্ধ্বে উঠে সামাজিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানায়।
সাহস ও প্রতিরোধ: শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস এবং আত্মত্যাগের মানসিকতা তাঁকে বিশ্বের তরুণ ও অ্যাক্টিভিস্টদের কাছে নেতা করে তোলে। তবে তাঁর উত্তরাধিকার বিতর্কমুক্ত নয়। সমালোচকরা কিউবার বিপ্লবের পর তাঁর নেতৃত্বাধীন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা এবং তাঁর সামরিক কঠোরতার সমালোচনা করেন। অনেকে তাঁর ‘ফুয়েকো’ তত্ত্বকে অন্যান্য দেশে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেন, কারণ এই তত্ত্ব স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর জটিলতা উপেক্ষা করেছিল।
কিন্তু সমস্ত বিতর্ক সত্ত্বেও, চে আজও বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের আগ্রাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে বিদ্যমান। তাঁর জীবন তৃতীয় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে শিখিয়েছে—অবিচার মেনে নেওয়া নয়, প্রতিরোধ অপরিহার্য।
চে’র মৃত্যু হয়েছিল এক গুলিতে, কিন্তু তাঁর ধারণার মৃত্যু হয়নি। তাঁর মুখ আজও ঝুলে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে, কৃষকের মিছিলে, কিংবা অনলাইনের বিপ্লবী পোস্টারে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়— বিপ্লব কোনো ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আটকে থাকে না, এটি এক আত্মিক দায়বদ্ধতা।
তৃতীয় বিশ্বের মুক্তি তাই এখনো অসমাপ্ত এক ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের প্রতীকে, চে আজও দাঁড়িয়ে যেন বলছেন, বাঁচতে হলে লড়তে হবে।


