২০১৫ সালে সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর সালমান বিন আবদুল আজিজ সৌদি আরবের নতুন বাদশাহ হিসেবে অভিষিক্ত হন। বাদশাহ আবদুল্লাহ ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। নতুন বাদশাহ প্রথমে যুবরাজ (ক্রাউন প্রিন্স) হিসেবে তাঁর সৎভাই মুকরিন বিন আবদুল আজিজকে মনোনীত করেছিলেন, যিনি তখন ৬৮ বছর বয়সী ছিলেন। তবে মাত্র তিন মাস পর বাদশাহ সালমান সৎভাইকে বরখাস্ত করে মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ৫৫ বছর বয়সে ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে মনোনীত করেন, যিনি বাদশাহের ভাইপো। পাশাপাশি তিনি ২৯ বছর বয়সী মোহাম্মদ বিন সালমানকে ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেন।
সেই সময় মোহাম্মদ বিন সালমানের নাম দেশটির রাজনীতিতে নতুন, এবং খুব কম মানুষই তাঁর সম্পর্কে জানতেন। অন্যদিকে মোহাম্মদ বিন নায়েফকে মার্কিন প্রশাসন প্রশংসা করত। তিনি প্রতিরক্ষা ও সন্ত্রাস দমন প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, এমনকি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডেও প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ২০০৯ সালের আগস্টে ইয়েমেনে আত্মঘাতী বোমা হামলার সময় তার জীবন বিপন্ন হয়েছিল।
মোহাম্মদ বিন সালমানকে এমবিএস নামে বহুল পরিচিত। লেখক ডেভিড বি ওটাওয়ে তাঁর বইয়ে লিখেছেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পদে যোগদান করার পর তিনি নিজের প্রভাব বাড়াতে শুরু করেন। শুরুতেই তিনি বাদশাহকে পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের থেকে আলাদা করে ফেলেন এবং এমনকি বাদশাহকে তাঁর স্ত্রী ও দুই বোনের সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি বিমানবাহিনীর হামলার তত্ত্বাবধান করেন। প্রথমে দেশজুড়ে এই হামলার প্রশংসা হয়, কিন্তু কিছুদিন পর এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৌদি আরবের জন্য সমস্যা তৈরি করে।
মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ক্রাউন প্রিন্স পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু হয়। ২০১৫ সালের ২০ জুন রাতে পবিত্র মক্কায় রাজপরিবারের সদস্যদের একত্রিত করে অনুষ্ঠিত সভায় মোহাম্মদ বিন নায়েফকে গৃহবন্দী করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় তাকে ক্রাউন প্রিন্স পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, বিন নায়েফকে পদত্যাগের জন্য চাপ দিতে তার রক্ষী ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টও বাজেয়াপ্ত করা হয়।
মোহাম্মদ বিন সালমান ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার পর রাজনৈতিক ও আর্থিক ক্ষমতা দ্রুত নিজেদের হাতে নিয়ে নেন। তিনি সৌদি আরবে প্রিন্সদের ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেন। পাশাপাশি ২০১৭ সালে সরকারি তহবিল তছরুপের অভিযোগে ৩৮০ জন প্রিন্স, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেন। তাদের মধ্যে অন্তত ১১ জন প্রিন্স ছিলেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং পাঁচ তারকা রিটজ-কার্লটন হোটেলে রাখা হয়। পরে তারা সরকারের কাছে জরিমানা প্রদান করে মুক্তি পান।
সৌদি রাজনীতিতে তার প্রভাব আরও দৃঢ় হয়, যেমন লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সাদ আল-হারিরিকে বাধ্য করে পদত্যাগ করানো। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এই পদক্ষেপ রাজনীতির ওপর তার একনায়কী ক্ষমতা প্রদর্শন করে।
মোহাম্মদ বিন সালমানের শাসনকাল বিভিন্ন সমালোচনা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০১৮ সালের রিপোর্টে বলা হয়, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ২,৩০৫ জনকে আটক করা হয়েছিল, যার মধ্যে ২৫১ জন তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে ছিলেন এবং তাঁদের কখনো বিচারকের সামনে হাজির করা হয়নি। এছাড়া ২৬ জন সাংবাদিকও বন্দী ছিলেন।
সর্বাধিক বিতর্ক সৃষ্টি হয় সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ড নিয়ে। তুরস্কের সৌদি দূতাবাসে খাসোগি খুন হন। পরে তদন্তে প্রকাশিত হয়, মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের তত্ত্বাবধানে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং সিআইএ মনে করে, যুবরাজ নিজেই নির্দেশ দিয়েছিলেন। ২০১৯ সালের একটি সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ বিন সালমান বলেন, তিনি হত্যাকাণ্ডের দায় নিলেও কিন্তু তিনি নিজে এটি করেননি।
রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সৌদি যুবক ও নারীদের মন জয় করার চেষ্টা করেছেন। ২০১৮ সালে নারীদের জন্য আবায়া পরিধান বাধ্যতামূলক নয় বলে ঘোষণা করা হয় এবং একই বছর নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অর্থনৈতিক কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
মোহাম্মদ বিন সালমানের বিলাসবহুল জীবনও সমালোচনার মুখে রয়েছে। ৪৪০ ফুট লম্বা ইয়ট কিনতে ৫০ কোটি ডলার খরচ এবং লিওনার্দো দা ভিঞ্চির চিত্রকর্ম কেনার ঘটনা তা প্রমাণ করে।
মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি রাজনীতিতে একক আধিপত্য স্থাপন করেছেন। পরামর্শমূলক পরিষদ ‘শুরা’ ও জ্যেষ্ঠ প্রিন্সদের সঙ্গে পরামর্শের ঐতিহ্য ভেঙে তিনি নিজেকে একমাত্র শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার সিদ্ধান্ত ও রাজনীতির বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ তিনি বরদাস্ত করেন না।
মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক বিতর্কের মধ্যেও মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি রাজপরিবার ও দেশকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন। ১৯৮৫ সালের ৩১ আগস্ট জন্ম নেওয়া তিনি এখনও দেশের যুবরাজ এবং প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কাড়ছেন।


