ভারতের বিহার রাজ্যে এই গ্রীষ্মে নির্বাচন কর্মকর্তা এবং কর্মীদের ওপর একটি অত্যন্ত কঠিন দায়িত্ব আরোপিত হয়েছিল। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ৮ কোটি যোগ্য ভোটারের পরিচয় যাচাই ও বাছাই সম্পন্ন করতে হয়েছিল। তবে কাজটি সহজ ছিল না। সময়টি ছিল ফসল কাটার মৌসুম, সাথে রাজ্যে প্রবল বন্যা চলছিল এবং দরিদ্র জনগণ কাজের সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাচ্ছিল।
নির্বাচনী কর্মীদের কাজকে আরও জটিল করে তুলেছিল নির্বাচন কমিশনের বিভ্রান্তিকর নির্দেশনা এবং আইনি-রাজনৈতিক চাপ। এর মধ্যেও কমিশন সময়মতো একটি খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছিল, যেখানে ৬৫ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়।
কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তাদের এক-তৃতীয়াংশ মৃত এবং বাকিরা অন্যত্র চলে গেছেন বা তাদের নাম একাধিকবার তালিকায় ছিল। কিন্তু বিরোধী দলগুলি প্রমাণ দেখিয়েছে মৃত বলে বাদ দেওয়া কয়েকজন ব্যক্তি এখনও বেঁচে আছেন। রাহুল গান্ধী এমন কয়েকজন ভোটারকে নয়াদিল্লিতে এনে তুলে এই ভুল প্রমাণ করেছেন।
বিরোধীরা অভিযোগ করেছেন যে, এই যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়া মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির নির্বাচনী কৌশলের অংশ, যাতে মুসলিম ও বিরোধী ভোটারদের ভোটাধিকার সীমিত করা যায়। এই প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা প্রক্রিয়াটিকে ১৯০০-এর দশকের যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে জটিল নথি ও সাক্ষরতা পরীক্ষার মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার রুদ্ধ করা হতো।
প্রক্রিয়াটি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছেছে। কমিশন কয়েক মাস আগে ২২ লাখ মৃত মানুষের নাম বাদ দিতে ব্যর্থ হওয়া নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিরোধীরা অভিযোগ করেছেন, গত কয়েকটি নির্বাচনে ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকার ভিত্তিতে ফলাফল প্রভাবিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে প্রক্রিয়াটি চলমান এবং শিগগিরই সম্পন্ন হবে, তবে ভোটারদের জন্য যথাযথ স্বচ্ছতা নেই।
এছাড়া ভোটারদের পরিচয় প্রমাণের শর্তও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। রাজ্যে ভোটারদের ১১ ধরনের নথি জমা দিতে বলা হয়েছিল, কিন্তু অধিকাংশ জনপ্রিয় পরিচয়পত্র যেমন ভোটার আইডি কার্ড ও আধার কার্ড প্রাথমিকভাবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট কমিশনকে আধারকে বৈধ পরিচয়পত্র হিসেবে যুক্ত করতে নির্দেশনা দিলেও মাঠপর্যায়ে অনেক কর্মী শুধুমাত্র আধার কার্ডের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছেন।
বিরোধী নেতা তেজস্বী যাদব অভিযোগ করেছেন খসড়া তালিকার ভিত্তিতে প্রতিটি বিধানসভা আসনে অনুমানের মাধ্যমে ২৫–৩০ হাজার ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি অনেক আসনের জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি, যা নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ ভোটারের ৯৮ শতাংশ তাদের নথি জমা দিয়েছেন। তবে কোন পরিচয়পত্র গ্রহণ করা হয়েছে তার স্পষ্ট তথ্য কমিশন এখনও প্রকাশ করেনি।
কিছু ভোটার বিশেষ করে যারা রাজ্যের বাইরে থাকেন বা ডিজিটাল সুবিধা নেই, তারা অভিযোগ দায়ের করতে পারছেন না। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার বলেন, শুধুমাত্র অগ্রসর শ্রেণির মানুষই এই ভুল সংশোধন করতে সক্ষম।
বিহারের ভোটার তালিকা যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়াটি সময়মতো সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক বিতর্ক, প্রক্রিয়াগত বিভ্রান্তি এবং স্বচ্ছতার অভাবের কারণে জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ভোটারদের জন্য পরিচয় প্রমাণের জটিলতা এবং অনুমানের উপর নির্ভরশীলতা নির্বাচনী স্বচ্ছতার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


