দক্ষিণ এশিয়ার সিনেমার প্রেক্ষাপটে নারীদের দীর্ঘকাল ধরে একঘেয়ে দুটি চরিত্রে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে— আত্মত্যাগী মা অথবা পুরুষের আনন্দের জন্য সাজানো প্রেমিকা। এই সীমানার বাইরে নারীকে খুব কমই দেখা গেছে। আর এই প্রেক্ষাপটেই ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্রগুলো হাজির হয় এক শক্তিশালী ভিন্নধারার মতো। বাংলার সবচেয়ে প্রশংসিত সমসাময়িক পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম, ঘোষ তাঁর সিনেমার ভুবনে নারীর প্রতিচ্ছবি নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি তুলে ধরেছেন নারীর অন্তর্জগত, আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের গল্প।
ঘোষের অবদান বুঝতে হলে আগে দেখতে হবে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যিক সিনেমার প্রচলিত ধারা। চলচ্চিত্র পণ্ডিত আশা কাসবেকরের মতে, এসব সিনেমা নারীর সতীত্ব ও সম্মান নিয়ে “অতিরঞ্জিত অলঙ্কারপূর্ণ বাগাড়ম্বর”-এ ডুবে থাকত। ফলে নারী চরিত্রকে দেখা যেত দুই ভাগে একদিকে “আদর্শ নারী”: পবিত্র, বাধ্য, বিনয়ী, আত্মত্যাগী; অন্যদিকে “ভ্যাম্প”: লাগামহীন যৌনতা ও নৈতিক স্খলনের প্রতীক। এই দ্বৈত কাঠামো পিতৃতান্ত্রিক ভাবাদর্শে প্রোথিত যা নারীর বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সিনেমায় জায়গা দেওয়ার সুযোগ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল।
এই জায়গা থেকেই ঋতুপর্ণ ঘোষ এক ভিন্নধারার পথ তৈরি করেন। তাঁর চলচ্চিত্রে নারী চরিত্র আত্মত্যাগী বা ভ্যাম্প নন, বরং জটিল, দ্বন্দ্বপূর্ণ এবং মানবিক। তাঁদেরও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা আছে, যা প্রায়ই সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁরা ভুল করেন, প্রশ্ন তোলেন, আবার প্রচলিত পরিবারকেন্দ্রিক সীমানার বাইরে নিজেদের পূর্ণতার খোঁজ করেন।
ঘোষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো পুরুষ দৃষ্টিকোণের বদলে নারী দৃষ্টিকোণকে সামনে আনা। সাধারণত সিনেমায় পুরুষের চোখ দিয়েই নারীকে দেখা হয়, কিন্তু ঘোষ উল্টে দেন এই দৃষ্টিভঙ্গি। “চোখের বালি” (২০০৩) এর বিখ্যাত দৃশ্য তার প্রমাণ। বিধবা বিনোদিনী অপেরা গ্লাস দিয়ে এক নবদম্পতিকে দেখে। ক্যামেরা কখনো তার চোখের ক্লোজআপে, কখনো তার দেখা দৃশ্যে। এখানে পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা পুরুষ নয়, বরং সমাজে অদৃশ্য হওয়ার কথা যাঁর— সেই বিধবার হাতে। বিনোদিনীর দৃষ্টিতে মিশে থাকে কৌতূহল, আকাঙ্ক্ষা, আবার এক ধরনের দুষ্টুমি। সে না চিরাচরিত সতী বিধবা, না ষড়যন্ত্রকারী প্রলোভনকারিণী, বরং নিজের আকাঙ্ক্ষা ও জটিলতা নিয়ে পূর্ণ এক নারী।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিনোদিনীর দৃষ্টি কোনোভাবেই অব্জেক্টিফায়িং নয়। বরং তা সহানুভূতিশীল, কৌতূহলী ও জটিল। এর মধ্য দিয়ে পর্যবেক্ষক-পর্যবেক্ষিত কিংবা ক্ষমতাবান-অক্ষম বাইনারির বাইরে গিয়ে সম্পর্ক ও আকাঙ্ক্ষার বহুমাত্রিকতা বোঝার জন্য ঘোষ দর্শককে চ্যালেঞ্জ করেন।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে নারী যৌনতা প্রায়ই নিষিদ্ধ বিষয়। অথচ ঘোষ সেটিকেই বিপ্লবী ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। “অন্তরমহল” (২০০৫)-এর মহামায়া চরিত্রটি তার বড় উদাহরণ। ১৯শ শতাব্দীর জমিদার বাড়িতে, উত্তরাধিকারী পাওয়ার জন্য জমিদার ছোট স্ত্রীকে গর্ভবতী করার সময় পুরোহিত দিয়ে মন্ত্র পড়াচ্ছেন। সেই আচার নারীর শরীরের ওপর ধর্মীয় ও যৌন নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। এ সময় মহামায়া যে আসলে প্রান্তিক, অবহেলিত সে পুরোহিতকে লক্ষ্য করে শাড়ির আঁচল সামান্য তুলে গোড়ালি দেখান। এই সামান্য কাজই রক্ষণশীল সমাজে এক চরম অশ্লীলতা। কিন্তু ঘোষের ক্যামেরা মহামায়ার মুখে ফোকাস করে—যেখানে ধরা পড়ে অবাধ্যতা ও পরিকল্পিত প্রলোভনের মিশ্রণ।
শেষে পুরোহিতের মন্ত্র থেমে যায়, মহামায়া বিজয়ের হাসি নিয়ে বেরিয়ে যান। এই দৃশ্যে নারী যৌনতা পুরুষের আনন্দের বস্তু নয়, বরং নারীর ক্ষমতার উৎস। একই সঙ্গে এটি ধর্মীয় ও পিতৃতান্ত্রিক মিলনকেও সমালোচনা করে।
দক্ষিণ এশিয়ার সিনেমায় মায়ের চরিত্র প্রায়ই আত্মত্যাগের প্রতীক। ঋতুপর্ণ ঘোষ “উনিশে এপ্রিল” (১৯৯৪) এ সেই ধারণাই বদলে দেন।
সরোজিনী একজন খ্যাতনামা নৃত্যশিল্পী। তিনি প্রচলিত অর্থে আত্মত্যাগী মা নন, বরং কর্মমুখর, দূরবর্তী, কখনো কঠোর। তার মেয়ে অদিতি বাবার মৃত্যুবার্ষিকীর কথা মনে করালে সরোজিনী তা ভুলে গিয়ে নিজের পুরস্কার উদযাপনকে অগ্রাধিকার দেন। এখানেই স্পষ্ট হয় দ্বন্দ্ব— মা হিসেবে পরিচয় বনাম শিল্পী হিসেবে পরিচয়।
এক পর্যায়ে সরোজিনী বলেন, “আমারও স্বপ্ন ছিল।” এই সংলাপই মায়ের চিরাচরিত আত্মবিসর্জনের ধারণাকে ভেঙে দেয়। তিনি দেখান, নারী মায়ের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ নন, বরং তাঁরও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে।
মা-মেয়ের দ্বন্দ্বের আবেগঘন মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘোষ তুলে ধরেন সম্পর্কের বাস্তবতা—রাগ, ভুল বোঝাবুঝি, আঘাত যা সাধারণত সিনেমায় আড়াল করা হয়। এর মধ্য দিয়েই তিনি প্রমাণ করেন পরিবারও জটিল, দ্বন্দ্বপূর্ণ, অসম্পূর্ণ, যেমন বাস্তব জীবন।
এখন ভাবলে মনে হয়, ঋতুপর্ণ ঘোষের অ-হেটেরোনরমেটিভ পরিচয় পরিচয় তাঁর সিনেমার নারীবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। প্রচলিত লিঙ্গ পরিচয়ের বাইরে থেকে তিনি হয়তো নারীদের ওপর আরোপিত সামাজিক চাপগুলোকে ভিন্নভাবে অনুভব করতেন। সেই বহিরাগত অভিজ্ঞতা আর শিল্পীসুলভ সংবেদনশীলতা তাঁকে নারীর সূক্ষ্ম মানসিকতা ও সংগ্রাম বোঝার চোখ দিয়েছে।
বিনোদিনীর প্রান্তিকতা, মহামায়ার প্রলোভন, সরোজিনীর দ্বন্দ্ব সবই সমাজের কঠোর কাঠামোর ভেতরে নারীর পথ খোঁজার গল্প। আর এখানেই ঘোষের cinema queer অভিজ্ঞতা আর নারীবাদী চেতনার মিলন ঘটায়।
ঋতুপর্ণ ঘোষ আজ দক্ষিণ এশিয়ার সিনেমায় এমন এক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যা প্রমাণ করে প্রতিনিধিত্ব কতটা শক্তিশালী হতে পারে। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নারীর জটিলতা, দ্বন্দ্ব ও স্বপ্নকে যে জায়গা দিয়েছে তা এখনও সমসাময়িক। যে বিশ্ব এখনও লিঙ্গ সমতা ও উপস্থাপনার প্রশ্নে লড়ছে, সেখানে ঘোষের চলচ্চিত্র অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কারণ তাঁর সিনেমা সব জটিলতা, আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিবাদসহ সত্যিকারের মানুষ হিসেবে নারীকে দেখে, পুরুষতান্ত্রিক চোখে নয়।


