বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত ক্রমশ আমদানিনির্ভর হয়ে উঠছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস , ফার্নেস অয়েল, কয়লা এবং ভারত ও নেপাল থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ আমদানি মিলিয়ে বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৬২ শতাংশ পূরণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)–এর গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য।
‘জ্বালানির রূপান্তর: বাংলাদেশ কি সঠিক পথে?’ শীর্ষক সেমিনারে এ গবেষণা উপস্থাপন করেন আইইইএফএর বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম। তিনি বলেন, কয়লার প্রায় পুরোটা, গ্যাসের ২৫-৩০ শতাংশ এবং ফার্নেস অয়েল আমদানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় অংশ এখন আমদানি-নির্ভর।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার ছিল ৭১ হাজার ৪১৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা যার মধ্যে ৩৯.৯ শতাংশ আমদানি করা হয়। পরের বছর অর্থাৎ ২০২০-২১ সালে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ হাজার ৪২৩ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টায় এবং এ সময় আমদানিনির্ভরতার হার পৌঁছে যায় ৫০ শতাংশে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যবহৃত ৮৫ হাজার ৬০৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের মধ্যে ৫৫.৫ শতাংশ, ২০২২-২৩ সালে ৮৮ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টার মধ্যে ৫৬.৫ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় এক লাখ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ আমদানিনির্ভর ছিল।
এ আমদানিনির্ভরতা বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ছিল ৪ টাকা ৮৮ পয়সা, যেখানে গড় বিক্রিমূল্য ছিল ৫ টাকা ৯১ পয়সা। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ টাকা ৩৫ পয়সায়, আর গড় বিক্রিমূল্য ছিল ৬ টাকা ৭৮ পয়সা। প্রতি ইউনিটে ৪ টাকা ৫৭ পয়সা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকারকে, যা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে।
সেমিনারে অংশ নেওয়া ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, দেশে বিদ্যুতের ব্যয় লুণ্ঠনমূলক খরচ ও মুনাফা বৃদ্ধির কারণে বেড়েছে। সরকার ব্যয়ের কারণ হিসেবে উৎপাদন খরচ ও ডলারের দাম বাড়াকে দায়ী করলেও আসলে ব্যয়ের হিসাবের স্বচ্ছতা নেই।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন খান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগানো হচ্ছে না। তাঁর মতে শুধু চট্টগ্রাম বিভাগের খাসজমির ৫ শতাংশ ব্যবহার করলেই ২৮ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। তিনি বিপিডিবিকে পুনর্গঠন করে আলাদা রেগুলেটরি অথরিটি গঠনের পরামর্শ দেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দক্ষ জনবল ও আর্থিক সহায়তার অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইপিসি কোম্পানিগুলো বছরে পর্যাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা রাখে না, আবার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে।
সেমিনারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—২০৩০ ও ২০৪০ সালের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির রোডম্যাপ তৈরি, ধাপে ধাপে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করা, রুফটপ সৌর প্রকল্পে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়া, ক্ষুদ্র প্রকল্পের সরঞ্জাম আমদানি শুল্কমুক্ত করা, এলএনজি নির্ভরতা কমানো, সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি বাস্তবায়ন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের ব্যবহার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
বিদ্যুৎ খাতের ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।


