২০শ ও ২১শ শতাব্দীর উদ্বাস্তু সংকট, কীভাবে যুদ্ধ আর জলবায়ু মানুষের পরিচয় কেড়ে নিচ্ছে?

ইতিহাসের পাতায় মানবজাতির সবচেয়ে করুণ এবং যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাস্তুচ্যুতি ও উদ্বাস্তু সংকট। ২০শ এবং ২১শ শতকে এই সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে। আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় বিভাজন, যুদ্ধ, জাতিগত সংঘাত এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য এর মূল কারণ।

২০শ শতাব্দী মূলত দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং অসংখ্য আঞ্চলিক সংঘাতের সাক্ষী। এই সময়কালের উদ্বাস্তু সংকটের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল এই যুদ্ধগুলো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। পুরনো সাম্রাজ্যগুলো ভেঙে নতুন জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়। এই পরিবর্তনের ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষ নিজ নিজ ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর গ্রিক, আর্মেনিয়ান এবং তুর্কিদের মধ্যে ব্যাপক জাতিগত সংঘাত শুরু হয়, যা লক্ষ লক্ষ মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। এর ফলে, নান্সেন পাসপোর্ট নামক একটি আন্তর্জাতিক দলিল তৈরি করা হয়, যা রাষ্ট্রহীন উদ্বাস্তুদের চলাচলে সহায়তা করে। এটি ছিল আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু ব্যবস্থাপনার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। নাৎসি জার্মানির হলোকাস্টের ফলে ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর নেমে আসে অবর্ণনীয় নির্যাতন। লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে হয় হত্যা করা হয়, নয়তো দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। যুদ্ধের শেষে, জার্মানি, পোল্যান্ড এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে জাতিসংঘ (United Nations) গঠিত হয় এবং ১৯৫১ সালের জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশন (Refugee Convention) তৈরি হয়। এই কনভেনশন উদ্বাস্তুদের আইনি সুরক্ষা প্রদান করে এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায় – যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন-নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লক। স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় অসংখ্য সংঘাত শুরু হয়।

১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে। এই সময় স্বাধীনতার আন্দোলন এবং নতুন জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া তীব্র আকার ধারণ করে। এই প্রক্রিয়া চলাকালীন অনেক সময় জাতিগত এবং রাজনৈতিক সংঘাত দেখা দেয়। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়, যা আজও বিশ্বের অন্যতম বড় উদ্বাস্তু সংকট হিসেবে পরিচিত।

ভিয়েতনামের যুদ্ধ, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন, এবং বিভিন্ন লাতিন আমেরিকান দেশে গৃহযুদ্ধের কারণে প্রচুর মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। বিশেষ করে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষে ‘বোট পিপল’ নামে পরিচিত ভিয়েতনামের শরণার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়। এই সময়কালে শরণার্থী সংকট আর কেবল ইউরোপের সমস্যা ছিল না, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যায় রূপ নেয়।

২১শ শতাব্দীতে উদ্বাস্তু সংকটের কারণগুলো আরও জটিল হয়েছে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এখন বাস্তুচ্যুতির নতুন কারণ।

২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক অভিযান শুরু করে। এই যুদ্ধগুলো লক্ষ লক্ষ আফগান ও ইরাকিকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। বিশেষ করে, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থান মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে, যা সিরিয়া, ইরাক এবং ইয়েমেনে ব্যাপক মানবিক সংকটের জন্ম দেয়।

২০১১ সালে শুরু হওয়া সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ২১শ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় উদ্বাস্তু সংকটের জন্ম দিয়েছে। প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ সিরীয় নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যার মধ্যে ৬০ লক্ষের বেশি শরণার্থী হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। জার্মানি, সুইডেন, এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো এই শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু এর ফলে ইউরোপে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা বেড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন একটি নতুন ধরনের উদ্বাস্তু সংকট তৈরি করছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চল, প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্রগুলো এবং আফ্রিকার সাব-সাহারান অঞ্চলের মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। জলবায়ু শরণার্থী (Climate refugees) নামক এই নতুন শ্রেণি আন্তর্জাতিক আইনে এখনো সেভাবে স্বীকৃতি পায়নি, যা তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

২০শ ও ২১শ শতাব্দীর ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উদ্বাস্তু সংকট একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর মানবিক সংকট। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই সংকট মোকাবিলায় নিরন্তর কাজ করে গেলেও এর মূল কারণগুলো এখনো সমাধান করা সম্ভব হয়নি।

ভবিষ্যতে এই সংকট আরও বাড়তে পারে। বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান জাতিগত সংঘাত এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নতুন নতুন উদ্বাস্তু সংকটের জন্ম দেবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শরণার্থীদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো। আমাদের মনে রাখতে হবে, উদ্বাস্তু সংকট কোনো একটি দেশের একক সমস্যা নয়, এটি মানবজাতির সম্মিলিত সংকট। এই সংকট সমাধানে প্রতিটি দেশ এবং ব্যক্তির দায়িত্ব রয়েছে। সহনশীলতা, সহমর্মিতা এবং মানবিকতা দিয়েই কেবল এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন