মুঘলরা বিদেশি নয়, ভারতীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন : ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন

ভারতে ইদানীং প্রায়ই মুঘল সাম্রাজ্যকে ‘বিদেশি’ শক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হয়। সমালোচকদের মতে, পাঠ্যবই সংশোধনের মাধ্যমে ভারতের বহুত্ববাদী অতীতকে মুছে ফেলে একটি হিন্দুত্ববাদী বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে বর্তমান বিজেপি সরকার।

এর অংশ হিসেবে দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাস বই থেকে মুঘল দরবারের ৩০ পৃষ্ঠার পুরো অধ্যায় মুছে ফেলা হয়। মুঘলদের চিত্রিত করা হয় ‘শোষক ও বর্বর’ হিসেবে। মহীশুরের টিপু সুলতানকে আখ্যা দেওয়া হয় ‘হিন্দুদের গণহত্যাকারী’ হিসেবে।

মুঘলদেরকে শত্রু হিসেবে হাজির করা নতুন এই বয়ানের সঙ্গে একমত নন মার্কিন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক রিচার্ড এম ইটন। ভারতের মধ্যযুগের ইতিহাস নিয়ে গবেষণার জন্য খ্যাতিমান এই অধ্যাপকের মতে—মুঘলরা বিদেশি নয়, বরং পুরোপুরিভাবে ভারতীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা এই দেশের মাটি-সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল।

সম্প্রতি ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’-কে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে এই অভিমত ব্যক্ত করেন যুক্তরাষ্ট্রের আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।

ইটনের ভাষ্য—ষোড়শ শতকে যখন মুঘলরা ক্ষমতায় আসে, তখন ‘দেশি’ ও ‘বিদেশি’ সংজ্ঞা বা আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের অস্তিত্বই ছিল না। তিনি বলেন, ‘সময়টা জাতিরাষ্ট্রের ছিল না। প্রজাদের আনুগত্য ছিল ব্যক্তির প্রতি; রাজা বা তার বংশের প্রতি।’ তাই আধুনিক মানদণ্ডে মুঘলদের বিদেশি হিসেবে বিচার করা ‘ঐতিহাসিক ভুল’ বলে মনে করেন তিনি।

উজবেকিস্তানের ফারগানা থেকে রাজ্য জয়ে আসা জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে ‘ভারতীয়’ হয়ে উঠেছিল, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইটন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে মুঘলদের মৌলিক পার্থক্যও তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ‘মুঘলরা তাদের সম্পদ ভারতেই বিনিয়োগ করেছেন। তারা তাদের স্থাপত্য এখানে তৈরি করেছেন। তাদের সমাধিও এখানেই। ভারতই ছিল তাদের স্বদেশ।’ এর বিপরীতে ব্রিটিশদের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্রিটিশরা ভারতের সম্পদ শোষণ করে ইংল্যান্ডে পাচার করেছে। এটাই হলো মৌলিক পার্থক্য।

অধ্যাপক ইটনের বক্তব্য—মুঘলরা শুধুমাত্র শাসনই করেনি, বরং এদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। তারা রাজপুতদের মতো স্থানীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে বৈবাহিক ও সামরিক জোট তৈরি করে একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। এর মাধ্যমে রাজপুতরা মুঘল সাম্রাজ্যের ‘সহ-অংশীদার’ হয়ে ওঠেন।

একইসঙ্গে মুঘলরা এদেশের শিল্প, স্থাপত্য, সংগীত ও সাহিত্যের বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এর ফলে একটি অনন্য মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম হয়, যা তাদের ভারতীয় পরিচয়কেই শক্তিশালী করে।

‘মুঘলদের বিচার তাদের জন্ম-পরিচয় দিয়ে নয়, বরং উপমহাদেশে তাদের তিন শতাব্দীরও বেশি সময়ের শাসন, সাম্রাজ্যের বিনির্মাণ ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার দিয়ে করা উচিত,’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ভারতে যখন মুঘল শাসকদের ‘অত্যাচারী বিদেশি’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন রিচার্ড ইটনের এই বিশ্লেষণ নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

(সূত্র : দ্য ডেইলি স্টার)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন