“… বাংলাদেশের বাস্তবতার পরিবর্তন ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব এখনো পুরোপুরি বিশ্লেষণ ও অনুধাবন করতে পারেনি দেশটি (ভারত)। তাদের গণমাধ্যমের ভাষ্য মতে, প্রথম থেকেই ভারতীয়দের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পেছনে বিদেশি শক্তির হাত ছিল। তাদের মতে পাকিস্তানের আইএসআই, যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ অথবা উভয় সংস্থাই এর পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছে। যে সরকারকে ভারত সমর্থন জানাচ্ছিল এবং যাদের নির্বাচনে কারসাজির বিষয়টিকে তারা জেনে-বুঝে এড়িয়ে গেছে, তারা জনসমর্থন পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল। এ বিষয়টি ভারতের নীতিনির্ধারকরা প্রথমত বুঝতেই পারেননি এবং পরবর্তীতে পরিবর্তিত বাস্তবতাকেও মেনে নিতে পারেনি।“
“জুলাই গণঅভ্যুত্থান’কে বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট বলা, এতে জনমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও উৎখাত পরবর্তী পরিবর্তিত শাসন ব্যবস্থার জনপ্রিয়তাকে দেখেও না দেখার অর্থ হলো ভারত মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে একেবারেই আমলে নিচ্ছে না এবং প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তার কোনো বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণও তারা করছে না। আমার দৃষ্টিতে, এ কারণেই ভারতের নীতিনির্ধারকরা এখনো পরিবর্তিত বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারছে না। সেইসঙ্গে অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে ভারতবিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও হয়তো এই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে বাড়তি ভূমিকা রেখেছে।“
“…. আমার সৌভাগ্য হয়েছে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে ছয়টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার। আমাকে যে বিষয়টি গভীরভাবে বিস্মিত ও হতাশ করেছে তা হলো, তারা খুব সহজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিষয়গুলোকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে এবং সাক্ষাৎকারের সময় আমার সামনে সেগুলোকে তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তারা এগুলোর সত্যতা যাচাই করার চেষ্টাও করেনি। দ্য ডেইলি স্টার যেসব তথ্যের সত্যতা যাচাই করেছে সেগুলো তুলে না ধরে, বরং বিবিসির ফ্যাক্টচেকিংয়ের ফলাফল দিয়ে তাদের যুক্তিখণ্ডন করেছি। বাস্তবে যা ঘটেছে সেটাকে আমলে না নিয়ে, তারা যেটা বিশ্বাস করতে চায় সেটাই বিশ্বাস করেছে।“
“… ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে, বিষয়টি নিয়ে ভারতকে আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়ে যেতে হবে-এমনকি, অন্য দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেমন হবে, সেটা নিয়েও। বিষয়গুলো নিয়ে তাদের এমন ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে, যাতে সকল পক্ষেরই স্বার্থ রক্ষা হয়। আর আমাদেরও অনুধাবন করতে হবে যে ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নির্ধারণে ‘গড্ডালিকা প্রবাহে’ গা ভাসানো যাবে না এবং সব জায়গায় ভারতবিরোধী মনোভাব ধরে রাখলে ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অর্জনের লক্ষ্য পূরণ হবে না। …“
মাহফুজ আনাম, সম্পাদক, দ্য ডেইলি স্টার। ৪ অক্টোবর প্রকাশিত মন্তব্য কলামের অংশবিশেষ


