মোবাইল ফোন, স্মার্টওয়াচ, ইয়ারফোন, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ডিভাইসগুলো চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে চার্জিং প্রযুক্তি। তবে তারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চার্জ দেওয়া অর্থাৎ তারযুক্ত চার্জিং ব্যবস্থায় অনেক অস্বস্তি এবং সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই প্রযুক্তি বিশ্বে ‘ওয়্যারলেস চার্জিং’ বা তারবিহীন চার্জিং একটি নতুন দিগন্ত খুলেছে, যা আধুনিক ব্যবহারকারীদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্য এবং কার্যকারিতার সমাধান নিয়ে এসেছে।
ওয়্যারলেস চার্জিং মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে বিদ্যুৎ তার বা কেবল ছাড়াই ডিভাইসে সরবরাহ করা হয়। এটি প্রধানত দুটি পদ্ধতিতে কাজ করে, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইনডাকশন ও রিজোন্যান্ট কন্ডাক্টিভ পাওয়ার ট্রান্সফার (Resonant Conductive Power Transfer)।
ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইনডাকশনে চার্জার (ট্রান্সমিটার) এবং ডিভাইসের মধ্যে বিদ্যুতের চুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি হয়। চার্জার থেকে উৎপন্ন চুম্বকীয় শক্তি ডিভাইসের রিসিভার কুণ্ডলিতে ধরা পড়ে এবং বিদ্যুৎ শক্তিতে পরিণত হয়। এই পদ্ধতিতে চার্জিং হয় সীমিত দূরত্বে (সাধারণত ৪-৫ সেন্টিমিটার)।রিজোন্যান্ট কন্ডাক্টিভ পদ্ধতিতে আরও বড় দূরত্বে (১০ থেকে ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত) চার্জ ট্রান্সফার করা সম্ভব, যা উন্নত ওয়্যারলেস চার্জিং প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করছে।
ওয়্যারলেস চার্জিং সাধারণত Qi স্ট্যান্ডার্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। Qi স্ট্যান্ডার্ড একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, যা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ইনডাকশন পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি নিরাপদ, দক্ষ ও সহজে ব্যবহারযোগ্য।
সাধারণ ওয়্যারলেস চার্জারগুলোতে একটি ট্রান্সমিটার কুণ্ডলী থাকে, যেটি বৈদ্যুতিক শক্তি থেকে চুম্বকীয় শক্তি তৈরি করে। ব্যবহারকারীর ডিভাইস যখন চার্জারের ওপর বা কাছাকাছি রাখা হয়, তখন ডিভাইসে থাকা রিসিভার কুণ্ডলী সেই শক্তি গ্রহণ করে বিদ্যুতের রূপান্তর ঘটায়।
ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের সুবিধা তার ছাড়াই চার্জ করা যায়, তাই জটিল তার ব্যবস্থাপনা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। চার্জিং পোর্টের ঘষাঘষি কম হওয়ায় ডিভাইসের পোর্ট নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কম। চার্জারের ব্যবহারে কম ক্ষতি হয় পরিবেশে কারণ তার কম ব্যবহারের ফলে ইলেকট্রনিক বর্জ্যও কম হয়।
অসুবিধা হলো তারযুক্ত চার্জিংয়ের তুলনায় ওয়্যারলেস চার্জিং কম দক্ষ, যার ফলে চার্জ হওয়ার সময় বেশি লাগে। বর্তমানে অধিকাংশ ওয়্যারলেস চার্জার খুব কাছাকাছি থাকতে হয়, দূরত্ব বেশি হলে চার্জ হয় না। চার্জিংয়ের সময় ডিভাইসের তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
গত দশকে ওয়্যারলেস চার্জিং প্রযুক্তি ব্যাপক উন্নত হয়েছে। স্মার্টফোন নির্মাতারা যেমন অ্যাপল, স্যামসাং, গুগল ইত্যাদি কোম্পানি তাদের ডিভাইসগুলোতে Qi স্ট্যান্ডার্ডের ওয়্যারলেস চার্জিং সিস্টেম যুক্ত করেছে। এছাড়াও স্মার্টওয়াচ, ইয়ারফোন, ব্লুটুথ স্পিকারসহ অন্যান্য গ্যাজেটেও এই প্রযুক্তি ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে।
বাংলাদেশেও এখন ওয়্যারলেস চার্জার পাওয়া যায় এবং ধাপে ধাপে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। দেশে কিছু প্রতিষ্ঠানও নিজস্ব ওয়্যারলেস চার্জিং ডিভাইস তৈরি ও বিক্রয় করছে।
গবেষকরা এখন আরও দীর্ঘ দূরত্বে চার্জিং এবং দ্রুত চার্জিংয়ের দিকে কাজ করছেন। পাশাপাশি, “ওয়্যারলেস পাওয়ার নেটওয়ার্ক” তৈরির চিন্তাও চলছে, যেখানে পুরো ঘর বা অফিসে তারবিহীনভাবে যন্ত্রপাতি চার্জ হবে। তবে এর সাথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যেমন, শক্তির অপচয় কমানো, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন ডিভাইসের মধ্যে মানসম্মত সামঞ্জস্যতা তৈরি করা।


