এস এম সুলতান কেন জাতিস্মর : হাসনাত আবদুল হাই, কবি ও লেখক

চিত্রশিল্পীর প্রথাসিদ্ধ পথে না গিয়ে এস এম সুলতান নিজের অভিলাষ অনুযায়ী অগ্রসর হয়েছেন স্বতন্ত্র হয়ে। এই যাত্রায় যতি ছিল না অন্তিমের আগে, কিন্তু বিরতি ছিল মাঝেমধ্যেই, কখনো ইচ্ছায় কখনোবা অনিচ্ছায়। জীবনের প্রথম পর্বে ক্রমাগত এ শিল্পীর ঠিকানা বদলেছে, থেকেছেন স্থান থেকে স্থানান্তরে, দেশে ও বিদেশে। শৈশব থেকে উত্তর-যৌবনাবধি তাঁর জীবন ছিল যাযাবরের। থিতু মানুষের আটপৌরে জীবনযাপনের পরিবর্তে পরিব্রাজকের মতো ভ্রমণ ছিল তাঁর নিয়তিনির্ধারিত, কেননা তাঁর ধমনির রক্তে ছিল, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘আতাভিজম’, বাংলায় ‘পূর্বপুরুষের স্বভাবের প্রতিধ্বনি’। স্বভাবে জীবনাচরণে পুর্বপুরুষের একজন হয়ে, তাঁদের মতো তাঁকে যেতে হয়েছে দেশ থেকে দেশান্তরে নিজের ঠিকানা খুঁজে পেতে।অনেক লোকালয়ে আশ্রয় পেয়েছেন, কিন্তু মনে হয় শান্তি পাননি, পাননি স্বস্তি; যে কারণে আবার বেরিয়ে পড়তে হয়েছে নিজের প্রকৃত ঠিকানার খোঁজে।

শেষ পর্যন্ত সেই ঠিকানা সুলতান পেয়েছিলেন, যেখানে তাঁর শিকড় প্রোথিত। তাঁর নিজের জীবনের বৃত্তের ভেতরই ছিল ঠিকানাটি, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল তাঁর আত্মজীবনের পরিচয় অনুসন্ধানের যাত্রা। নাড়ির সম্পর্ক যে নড়াইল শহরের উপান্তে, চিত্রা নদীতীরে, সেখানেই নিজেকে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন পূর্বপুরুষের আদিম জীবনযাপনের সরলতায়; শ্যামল প্রকৃতির স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায়। কবি শামসুর রাহমান এই জনপদ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সেখানে প্রকৃতি আপন মহিমায় অভিষিক্ত…পুরুষ আর নারীর ধড়-মূর্তি বৈভবে আর প্রাঞ্জলতায় নিবিড় কৃষিনির্ভর সভ্যতার এক ঐকান্তিক রূপ।’ (দৈনিক স্বাধীনতা, ১৯৯৪)।

আশৈশব ছবি এঁকেছেন সুলতান। জন্মসূত্রে পাওয়া শিল্পপ্রতিভার দরুন ছবি আঁকাই ছিল তাঁর নিয়তি, যেমন পূর্বনির্ধারিত ছিল যাযাবর জীবন। তিনি নিজের তাগিদেই এঁকেছেন, খ্যাতি বা অর্থবিত্তের জন্য নয়। এঁকেছেন দেশ-বিদেশের মানুষের অসংখ্য প্রতিকৃতি, বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি। কিন্তু ছবি আঁকায় সিদ্ধহস্ত হলেও সুলতান যেন নিজের পরিচিতি গড়ে তুলতে পারছিলেন না। ষাট দশক পর্যন্ত তাঁর ছবি ভিন্ন পরিচয়ে বিশিষ্ট হয়ে চিহ্নিত হতে পারেনি।

১৯৭৪ সালে শিল্পকলা একাডেমিতে এস এম সুলতানের প্রথম একক প্রদর্শনী দেখে দর্শক-সমালোচক স্তম্ভিত, বিস্মিত এবং সংশয়ে দোদুল্যমান। কিন্তু অচিরেই অনেকের মধ্যে এই উপলব্ধি হলো যে তাঁরা এক অনন্যসাধারণ শিল্পীর শিল্পকর্মের মুখোমুখি, যা দেখার অভিজ্ঞতা শুধু নান্দনিক নয়, ইতিহাস পাঠের চেয়ে রোমাঞ্চকর। পেশিবহুল পুরুষ আর হৃষ্টপুষ্ট লাবণ্যময় মেয়েদের দেখিয়ে সুলতান যেভাবে তাঁর ছবিতে দর্শককে বাংলার গৌরবময় অতীত ঐতিহ্যের কথা বললেন, তার জন্য আলোড়িত, বিমোহিত হতে হলো তাঁদের।

কিন্তু কীভাবে তিনি এলেন এই নতুন আঙ্গিকের ছবি আঁকায়, কোথায় পেলেন এ ধারণা? তাঁর এর আগের কোনো ছবিতে নেই এর সামান্যতম আভাস–ইঙ্গিতও। তা হলে কী রূপে সম্ভব হলো অভূতপূর্ব এই শৈলীর ছবি আঁকা?

বিশালাকার মানুষের এসব ছবি আঁকার একটা ব্যাখ্যা এমন হতে পারে যে সুলতান হয়তো জাতিস্মর হয়ে জন্মেছিলেন। জাতিস্মর হয়ে জন্ম নেওয়ার অর্থই হলো, পূর্বজীবনের সব পরিচিত অনুষঙ্গ দেখে শনাক্ত করা এবং তাদের নিখুঁত বর্ণনা দেওয়া। কিংবদন্তির জাতিস্মর যাঁরা, তাঁদের বর্ণনায় নিজের পূর্বজন্মের স্মৃতি ফিরে আসে বর্তমানে। সেই মাফিক জাতিস্মররূপে সুলতান চলে গিয়েছেন পেছনে, পূর্বপুরুষের জীবনে। সমকালের বাস্তবে তাঁদের জীবনের অনুষঙ্গগুলো না থাকলেও তিনি আস্থার সঙ্গে ছবির ভাষায় বলেছেন, একদা এ–ই ছিল আমাদের পূর্বপুরুষদের বিশুদ্ধ আনন্দময় জীবন, এমন ছিল তাঁদের আদিম বলিষ্ঠ অবয়ব আর তরঙ্গায়িত পেশিবহুল হস্ত-পদযুগল।

সুদূর অতীতে গিয়ে পূর্বপুরুষের জীবনচিত্র অবলোকন করে এর মধ্যে নিজের জীবন খুঁজে পেয়ে নমিত উল্লাসে সুলতান বলতে চেয়েছেন, এমন ছিল আমাদের জীবনযাপনের চিত্র। অকুতোভয়, সাহসী মানুষ ছিলাম আমরা, আমাদের পুর্বপুরুষেরা। আমি নিশ্চিতভাবে এ কথা জানি বলেই সে সময়ের গৌরবের সব দিনকে রেখা আর রঙে দেখিয়েছি ছবিতে। পূর্বপুরুষদের পুনরুজ্জীবিত করেছি কাগজে, ক্যানভাসে। আর এভাবেই খুঁজে পেয়েছি আমার—আমাদের সামষ্টিক পরিচয়।সুলতান তাঁর বিশাল সব ক্যানভাসে সাহসী, বলিষ্ঠ আদিম মানুষের জীবনের চারণকবি হয়ে যেন এ–ও বলতে চেয়েছেন, এই যদি হয় আমাদের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য, তাহলে বর্তমানের হীন-দীন অবস্থা আর শীর্ণ শরীরের মানুষ সত্য বা চিরন্তন হতে পারে না। তারা হয় অলীক, মায়া অথবা ক্ষণস্থায়ী, অপস্রিয়মাণ।

কোনো জাতি যখন স্মৃতিভ্রষ্ট হয়, মনে হয় তখন এভাবেই আবির্ভাব ঘটে জাতিস্মরের। আর তাঁদের বলে যেতে হয় কিংবদন্তির ভাষ্য, যে কিংবদন্তি নিকট অথবা সুদূর অতীতের। কেন অতীতের আদিম মানুষের প্রতিকৃতি এঁকেছেন সুলতান, ওপরে তার একটা ব্যাখ্যা দেওয়া হলো। এখন দেখা যাক, কীভাবে এবং কোন উপায়ে এই চিত্রকর কিংবদন্তির কথা বলেছেন ক্যানভাসের রং–রেখায়।

জাতিস্মর হয়ে সুলতান যে কিংবদন্তির কথা বলেছেন, যে পূর্বপুরুষের ছবি এঁকেছেন, তা কি সত্যিই ছিল বাস্তবে, তাকে কি বলা যায় ঐতিহাসিক সত্য?গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছের যে সোনার বাংলা, তেমন দেশ, সেই কৃষিসভ্যতা, হয়তো কখনো বাস্তবে ছিল না, নেহাতই কল্পনা, অতিকথন, মিথ। কিন্তু মিথ হলেও তা একটি জাতির আদর্শ হয়ে বর্তমানের ক্ষুদ্রতাক্লিষ্ট এবং গ্লানিময় জীবনের বিকল্প হয়ে মানুষকে উৎসাহ জোগায়, সামনে অপেক্ষা করছে আনন্দময় জীবন—এমন বরাভয় জানায়।

এখানে রলাঁ বার্থস স্মর্তব্য, তিনি বলেছেন, মিথ কোনো বস্তু বা ফর্ম নয়, মিথ একটি ভাষা, যার মাধ্যমে কোনো বক্তব্য ব্যক্ত করা হয়। আর এই বক্তব্য প্রকাশের ভাষা লিখিত হতে পারে অথবা হতে পারে প্রতিকৃতি (মিথোলজিস, ১৯৫৭)। এস এম সুলতান তাঁর ছবিতে যে অসম্ভব বাস্তবের আলেখ্য লিখেছেন, তাকে বলা যায় বর্তমানের দুঃসময়ের পটভূমিতে আশাবাদী আর আলোকিত ভবিষ্যতের ইঙ্গিতবাহী এক তূর্যবাদকের ঘোষণা। স্মৃতিনির্ভর অতীতের ছবি এঁকে তিনি সন্ত পুরুষের মতো অভয় দিয়ে বলেছেন, এই যদি হয় আমাদের অতীত জীবনের চালচিত্র, তাহলে ভবিষ্যৎ সুখী ও সমৃদ্ধ হবেই। এ শিল্পীর চরদখলের ছবি আমাদের এ–ও বলে যে প্রয়োজনে কাস্তে ফেলে হাতে তুলে নিতে হবে বল্লম, ঢাল-তলোয়ার, রুখে দাঁড়াতে হবে তাঁদের বিরুদ্ধে, যাঁরা কেড়ে নিতে চান অধিকার। এভাবেই শিল্পী এস এম সুলতানের অপ্রচলিত ধারার ছবি হয়ে গেছে জীবনসংগ্রামের মেনিফেস্টো, সুখী-সমৃদ্ধ জীবনের ইশতেহার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন