১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট শুধু জাপানের নয়, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিনগুলোর একটি। সেদিন সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে মার্কিন বিমান B-29 “Enola Gay” থেকে হিরোশিমা শহরের উপর ফেলা হয় পৃথিবীর প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রের পারমাণবিক বোমা “লিটল বয়”। মুহূর্তের মধ্যেই শহরটি রূপ নেয় দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা এক আগ্নেয় নরকে।
সেই ঘটনার ৮০ বছর হয়ে গেছে। সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে প্রযুক্তি, রাজনীতি, সমাজ; কিন্তু হিরোশিমার ভয়াবহতা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় শক্তির সীমাহীন প্রয়োগ কতটা নির্মম হতে পারে।
হিরোশিমা ছিল একটি সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কিন্তু সঙ্গে তা ছিল একটি বসবাসযোগ্য, শান্তিপূর্ণ শহর। বোমাটি বিস্ফোরণের সময় যে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ মারা যায় তাদের অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক। তাপ, চাপ ও বিকিরণের সম্মিলিত ধ্বংসযজ্ঞে মানুষ শুধু জ্বলেই যায়নি, বিলীন হয়ে গিয়েছিল অস্তিত্ব।
বোমার শক্তি ছিল প্রায় ১৫ কিলোটন টিএনটির সমান। যারা তাৎক্ষণিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন, তারা পরে দীর্ঘমেয়াদি বিকিরণ, ক্যান্সার, গর্ভজাত ত্রুটি ও মনস্তাত্ত্বিক ট্রমার শিকার হন। হিরোশিমা হয়ে ওঠে যুদ্ধের নয়, বরং মানবজাতির নিষ্ঠুরতার প্রতিচ্ছবি।
বোমা ফেলার যুক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল এতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে এবং আরও বেশি প্রাণহানি ঠেকানো যাবে। কিন্তু সমালোচকেরা বলেন, এটি ছিল মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি একটি শক্তি প্রদর্শনের কৌশল। হিরোশিমা এবং পরে নাগাসাকিতে বোমা ফেলার ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও, এটি একটি পরমাণু যুগের সূচনা করে, যেখানে “শান্তি” ধারণাটি অস্ত্রের ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরমাণু পরীক্ষার মাধ্যমে পৃথিবী প্রবেশ করে এক বিপজ্জনক ভারসাম্যের—“Mutually Assured Destruction”—যুগে।
আজ ৮০ বছর পরেও হিরোশিমা একটি জীবন্ত স্মারক। সেখানে গড়ে উঠেছে Peace Memorial Park, যেখানে প্রতিবছর ৬ আগস্ট হাজার হাজার মানুষ মোমবাতি জ্বালিয়ে স্মরণ করে সেই ভয়াল দিনটিকে। বিশ্বনেতারা সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রতিজ্ঞা করেন এই ধরণের ট্র্যাজেডি যেন আর কখনো না ঘটে।
জাপানে এখনো প্রায় ১,২০,০০০ ‘হিবাকুশা’ (বোমা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি) জীবিত আছেন, যাদের জীবনজুড়ে রয়েছে ব্যথা, সামাজিক বর্জন ও স্বাস্থ্যগত জটিলতা। কিন্তু তাদের কণ্ঠই আজ পৃথিবীর বিবেক “No More Hiroshima, No More War”।
হিরোশিমা আমাদের শিক্ষা দেয় প্রযুক্তি, যদি মানবিক মূল্যবোধের বাইরে চলে যায়, তবে তা নির্মাণ নয়, ধ্বংসের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। একটি জাতির উপর পুরোপুরি ধ্বংস নেমে আসা কি কখনও ন্যায়সঙ্গত হতে পারে? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, যুদ্ধনীতি, মানবিক আইন সবকিছুই হিরোশিমার আলোকে নতুন করে ভাবা শুরু করে। জাতিসংঘের গঠনের পেছনেও ছিল এই বিভীষিকার তিক্ত স্মৃতি।
বর্তমানে বিশ্বে ৯টি দেশের কাছে রয়েছে প্রায় ১৩,০০০ পরমাণু অস্ত্র। রাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধ, জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা সব মিলিয়ে হিরোশিমা যেন এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা। মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে হিরোশিমা কেবল অতীত নয়, ভবিষ্যতেরও পূর্বাভাস হতে পারে। হিরোশিমা শুধু ইতিহাস নয়, একটি দায়।


