বাংলাদেশের অন্তর্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে বলা হয়েছে, মানবাধিকারের সুরক্ষা ও বিকাশে সহায়তা করার লক্ষ্যে একটি মিশন খোলার জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের অফিস এবং বাংলাদেশ সরকার তিন বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যে হত্যাকাণ্ড হয়েছিলো, তা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির জন্য ওই বছরের সেপ্টেম্বরে হাইকমিশনের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসেছিলেন।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি মহল আপত্তি জানিয়ে আসছে, বিশেষ করে কয়েকটি ইসলামপন্থি দল ও সংগঠন ‘ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ’ রক্ষায় প্রতিহত করার ডাক দিয়েছে। আবার মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশে জাতিসংঘের এই দপ্তর চালু হলে এখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য তা সহায়ক হবে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশন (Office of the High Commissioner for Human Rights – OHCHR) এমন একটি সংস্থা যার মূল কাজ হলো বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার রক্ষা, এ সংক্রান্ত প্রচার ও বাস্তবায়নে সহায়তা করা।
এই দপ্তরটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির তথ্য সংগ্রহ করে, পর্যালোচনা করে এবং প্রতিবেদন তৈরির মাধ্যমে সবার সামনে তা তুলে ধরে। সেসব প্রতিবেদন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।
এর মাধ্যমে সেসব দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ধারণা করতে পারে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনেক সময় উন্নত দেশগুলোর সম্পর্ক, বিনিয়োগ ও অনুদানের বিষয় নির্ভর করে।
বিশেষ করে, সংঘাতপ্রবণ দেশগুলোয় ওএইচসিআর-এর এই অফিসগুলো ওইসব দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। এরপর তারা তা বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন তৈরি করে।
বিশেষ করে নির্যাতন, বৈষম্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, নারী ও শিশুদের অধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলোতে তদন্ত ও প্রতিবেদন তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে এই অফিস।
অনেক সময় কোনো দেশে কার্যালয় না থাকলেও যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে, সেখানে বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে এই সংস্থাটি।এছাড়াও, মানবাধিকার সুরক্ষায় তারা সরকার, নাগরিক সমাজ, ভুক্তভোগী ও অন্যান্য অংশীজনের সাথে কাজ করে।
যদিও মানবাধিকার হাইকমিশনের প্রতিবেদন বা সুপারিশ কোনো দেশের জন্য পালন করা বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু অনেক সময় এসব প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে জাতিসংঘ ও উন্নত দেশগুলোর নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
ওএইচসিআর-এর সদর দপ্তর হলো সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে ওএইচসিআর-এর একটি নৈতিক-নীতিনির্ধারণী অফিস রয়েছে। সংস্থাটির ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় দু’শো দেশের মাঝে তাদের অফিস রয়েছে মাত্র ১৬টি দেশে। এই অফিসগুলো ওই দেশগুলো নিয়েই সংশ্লিষ্ট অফিসে বসে কাজ করে।
এই দেশগুলোর মাঝে রয়েছে– বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, চাড, কলম্বিয়া, গুয়াতেমালা, গিনি, হুন্ডুরাস, লাইবেরিয়া, মৌরিতানিয়া, মেক্সিকো, নাইজার, ফিলিস্তিন, সিরিয়া (লেবাননের বৈরুত থেকে পরিচালিত), সুদান, টিউনিশিয়া ও ইয়েমেন। এছাড়া, তাদের আরও দু’টো অফিস রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ায় ও ইউক্রেনে।
এই অফিসগুলোর বেশিরভাগই আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় যেখানে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বাকিগুলোর প্রায় সবই এশিয়া, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে।
ঢাকায় মানবাধিকার কমিশনের অফিস চালু নিয়ে আপত্তি জানিয়ে হেফাজতে ইসলাম বিবৃতিতে বলেছে — “এর আগেও বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন, ইসলামি শরিয়া ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে। নারী সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও একই চিত্র দেখা গেছে। এছাড়া, সমকামী তথা এলজিবিটি ইস্যুটি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের মানবাধিকার দর্শন ও নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত।”
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির বিষয়টি তুলে ধরে বলা হয়েছে–“ওএইচসিএইচআর মিশন মানবাধিকারের যেকোনো গুরুতর লঙ্ঘনের প্রতিরোধ ও প্রতিকার, বিগত সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর মনোনিবেশ করবে। এটি দেশের প্রতিষ্ঠিত আইনি, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কাঠামোর বাইরে থাকা কোনো সামাজিক এজেন্ডাকে উৎসাহিত করবে না।”
এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত সাংবাদিক নাজমুল আহসান ফেসবুকে লেখেন– “মধ্যপ্রাচ্যে জাতিসংঘ ব্যর্থ, সেই জাতিসংঘ বাংলাদেশে কী-ই বা করবে, এগুলো খোড়া যুক্তি।…জাতিসংঘের প্যালেস্টাইন বিষয়ক র্যাপোর্টারকে আমেরিকান নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কারণ তিনি গাজা ইস্যুতে অত্যন্ত সোচ্চার।…ইজরায়েলের ক্ষেত্রে মানবাধিকার হাই কমিশনার ও কাউন্সিল তাদের ক্ষমতার সব কিছু করেছে। ইজরায়েলের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাবও পাশ হয়েছে। এই কারণে মানবাধিকার কাউন্সিল থেকে আমেরিকা ও ইসরায়েল বের হয়ে গেছে।
কিন্তু ক্লিয়ারলি, তেমন পার্থক্য ঘটেনি। ইজরায়েলের উপর এই ধরনের চাপ কোনো কাজই করে না। কিন্তু আর দশটা সাধারণ দেশ সচরাচর এত চাপ নিতে পারে না। ফলে তাদেরকে অনেকটা শেমিং করে একটু নিবৃত্ত রাখার চেষ্টা করার কাজই হলো হাই কমিশনার ও হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের উদ্দেশ্য।
… লোকাল অফিসের আবার স্থানীয় কনটেক্সট থাকে। লোকাল অফিসের এজেন্ডা অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় লোকাল সিভিল সোসাইটির অগ্রাধিকারের উপর। আমাদের দেশের সিভিল সোসাইটির প্রায়োরিটি গে-লেসবিয়ান না। আমাদের দেশে হিউম্যান রাইটস সংক্রান্ত প্রধান ইস্যু আরও মৌলিক: মানুষ মেরে রাস্তায় লাশ ফেলে রাখলে, তার পোস্ট-মর্টেম হবে কি হবে না, এই ন্যূনতম বর্বরতম প্রশ্ন যেন না উঠে, সেটা নিশ্চিত করা। অতটুকু ন্যূনতম সভ্য অন্তত হওয়া।”
(সূত্র : বিবিসি বাংলা, ফেসবুক)


