স্যামুয়েলস্ : কথা প্রসঙ্গে আপনি উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন ‘কেউ যদি কখনো সিনেমাটোগ্রাফিক ব্যাকরণের দুই-দিনটি বেসিক নিয়ম শিখে যায়, তাহলে তার পক্ষে ইচ্ছেমতো কাজ করা সম্ভব, এমনকি নিয়মভাঙাও।’ আপনি কোন নিয়মগুলোর কথা বোঝাচ্ছিলেন?
আন্তোনিওনি : সবচেয়ে সহজ নিয়মগুলো : ক্রসকাটিং, অভিনেতা যদি আগেরবার ফ্রেম থেকে বামদিক দিয়ে বের হয়ে থাকে, তাহলে তাকে ডানদিক দিয়ে ঢুকানো ইত্যাদি। এ রকম শতশত নিয়ম ফিল্মস্কুলগুলোতে শেখানো হয় এবং আপনার সত্যিকারের ফিল্মমেকিং শুরু করার আগপর্যন্তই শুধু এগুলো কাজে আসে। এগুলো যে মূল্যহীন- নিজেকে তা বুঝানোর জন্য প্রায়ই এ রকম শুট করে থাকি আমি। আপনি একটা নিয়ম ভাঙ্গলেন, অথচ কেউই বুঝতে পারলো না; এর কারণ, দর্শকরা কেবল আপনার ‘ভ্রান্তি’গুলোই খেয়াল করবে। আর এটা যদি কাজে লেগে যায়, তাহলে কে যাবে নিয়মের তোয়াক্কা করতে!
স্যামুয়েলস্ : আপনার প্রথম ফিচার ফিল্ম স্টোরি অব অ্যা লাভ অ্যাফেয়ার-এ দ্বিতীয় ফিল্ম দ্য ল্যাডি উইদাউট ক্যামেলিয়াস-এর চেয়ে উদ্ভাবনী-ক্ষমতা ও ইনোভেটিভ ক্যামেরা-ওয়ার্ক বেশি ছিলো। যেমন ধরুন, দ্য ল্যাডি উইদাউট ক্যামেলিয়াস-এ কোনো চরিত্র যখন ক্যামেরার দিকে মুভ করেছে, তখন আপনি নিয়মিতভাবে তাকে ট্র্যাক করেছেন- যেটি কিনা নিশ্চিভাবেই নিয়মমাফিক ব্যাপার; অথচ স্টোরি অব অ্যা লাভ অ্যাফেয়ার-এ আপনার পরবর্তী ফিল্মগুলোর মতোই আপনি কখনো কখনো ভীষণ অর্থোডক্স বা গোঁড়া হয়ে উঠেছেন। এর কারণ কী?
আন্তোনিওনি : এই প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারবো না। আমি যখন ফিল্মের শুটিং করি, তখন একটা কিছুর শুট কীভাবে করতে চাই- সেই ভাবনা কখনো কাজ করে না আমার মধ্যে; আমি স্রেফ শুট করে ফেলি। এই যে একটি ফিল্ম থেকে আরেকটি ফিল্মে এসে আমার টেকনিকের বদলে যাওয়া- এটি একেবারেই সহজাত প্রবৃত্তির একটি ব্যাপার, এবং এটি কখনোই কোনো উদ্দেশ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ভিত্তিতে করা হয় না। তবে আমার মনে হয়, আপনি ঠিকই বলেছেন, দ্য ল্যাডি উইদাউট ক্যামেলিয়াস-এ স্টোরি অব অ্যা লাভ অ্যাফেয়ার-এর তুলনায় বেশি গোঁড়ামি ছিলো। এর কারণ, প্রথম ফিল্মটির শুটিংয়ের সময় আমি অনেক লং-টেক নিয়েছি; এবং এমনকি দৃশ্যটি শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আমার ক্যামেরা অভিনেতাদেরকে ফলো করেছে। কিন্তু জানেন তো, পরবর্তী সময়ে যতোটা ইনোভেটিভ ব্যাপার ঘটেছে, স্টোরি অব অ্যা লাভ অ্যাফেয়ার-এ তা অতোটা ছিলো না। নিয়ম আমি আরো অহরহ ভেঙেছি পরে এসে। দ্য অ্যাডভেঞ্চার দেখুন; এবং বিশেষ করে দেখুন ব্লো-আপ।
স্যামুয়েলস্ : আপনার ফিল্মগুলোর মধ্যে ব্লো-আপ সিনেমাটোগ্রাফিক্যালি সবচেয়ে আন-অর্থোডক্স। তবে একটা ব্যাপার আমাকে অবাক করেছে, তা হলো- ব্লো-আপ-এর যে ক্যামেরা-ওয়ার্ক, সেটির আদর্শ মনে হয়েছে আপনার শর্ট ডকুমেন্টারি লাইজ অব লাভকে; এটি অনেকটা কমিক কিংবা লাইভ অ্যাকশন কমিক স্ট্রিপসের মতো করে বানানো; এবং এটি পরের কাজটিতে দেখা মেলা ট্রিক-শটগুলোর অনেকটাই ধারণ করে আছে। উদাহরণ হিসেবে বলি, আমার ধারণা, যেকোনো কমিক-দৃশ্যের শটটি ক্যামেরায় এর প্রতিফলনে এসে হ্রাস পেয়েছে। ফটোগ্রাফি সম্পর্কিত যে দুটি ফিল্ম আপনি বানিয়েছেন, সেগুলোর শুটিংই সবচেয়ে জটিলতা ধারণ করে আছে- এটিকে কি আপনার কাছে নিছক কাকতালীয় ব্যাপারের চেয়েও বেশি কিছু বলে মনে হয় না?
আন্তোনিওনি : আপনি ঠিকই বলেছেন, ব্লো-আপ আমার সবচেয়ে আন-অর্থোডক্স ফিল্ম; তবে এটি আন-অর্থোডক্স হয়েছে মন্তাজে যেমন, তেমনি হয়েছে ফটোগ্রাফিতেও। এক্সপেরিমেন্টাল সেন্টারে [ফিল্মস্কুল] গেলে তারা আপনাকে শেখাবে, আপনি যেন অ্যাকশন চলাকালে কোনো শটের কাট না করেন। ব্লো-আপ-এও আমি এই জিনিসটি অব্যাহত রেখেছি। হেমিংস একটি ফোনবুথের দিকে হাঁটা দিয়েছে; সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে ফ্ল্যাশ দিয়ে সে কয়েকটি ফ্রেমের স্ন্যাপ নিয়েছে- এ দৃশ্যটি ভাবুন। কিংবা সেই দৃশ্যটির কথাই ধরুন, যেখানে সে ভারুশ্কার ছবি তোলে- এই অ্যাকশনটির সময় আমি কাট করে অনেকগুলো ফ্রেম নিয়েছি; করেছি তা-ই- যেটিকে সেন্টারের শিক্ষকেরা সম্পূর্ণরকম কুৎসিত বলে বিবেচনা করেন।
স্যামুয়েলস্ : দ্য অ্যাডভেঞ্চার প্রসঙ্গে কান ফেস্টিভ্যালের ইশতিহারে আপনি বলেছিলেন, নিজের প্রয়োজনীয়তা সঙ্গে নিজেকেই একেবারে বেমানান বোধ করে মহাশূন্যের চৌকাঠে বোঝা হয়ে উঠেছে মানুষ। এ কথা দিয়ে কী বুঝিয়েছিলেন?
আন্তোনিওনি : যা বলেছিলাম, ঠিক সেটিই বুঝিয়েছিলাম : মানে, আমরা এমন এক সংস্কৃতিতে আটকে আছি, যেটি বিজ্ঞানের মতো অতোটা অগ্রগামী নয়। বৈজ্ঞানিক মানুষ ইতোমধ্যে চাঁদে পৌঁছে গেছে, অথচ আমরা এখনো বাস করছি হোমার-প্রবর্তিত নৈতিক ধারণার মধ্যে। এই অচলাবস্তা, এই ভারসাম্যহীনতা দুর্বলচিত্তের মানুষকে করে তুলছে আতঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন; এটি আধুনিক জীবনের মেকানিজমের সঙ্গে তাদের মানিয়ে নেওয়া নেওয়াটাকে করে তুলছে ভীষণ দুরূহ।
স্যামুয়েলস্ : ব্লো-আপ বাদে আপনার বাকি ফিল্মগুলো কোনো না কোনো নারীকে ঘিরে বানানো- যে কিনা কোনো পুরুষকে বিশ্বাস করে ঠকেছে। এই প্লটটির পুনরাবৃত্তিকে কেন ধরে রেখেছেন আপনি?
আন্তোনিওনি : আপনার কথা শুনে বিষয়টি নিয়ে কেবলই চিন্তায় পড়লাম। আমি যা করি, তার ব্যাখ্যা আমার পক্ষে দেওয়া বেশ দুরূহ। আপনার উপলব্ধির চেয়েও অনেক বেশি, অনেক অনেক বেশি স্বভাবজাত ব্যাপার এটি। যেমন ধরুন, জোসেফ লসিকে নিয়ে লেখা একটি আর্টিক্যাল পড়ে, তার কাজ করার ধরন জেনে আমি মজা পেয়েছিলাম। তিনি একটি বই পড়ার পর সেটি যদি তার ভালো লাগে, তাহলে সেটি দিয়ে ফিল্ম বানান। কিন্তু কোনো প্রডিউসার যদি বলে, ‘অন্যকোনো ফিল্ম বানান’, তাহলে তিনি তার নিজের পছন্দকে বাদ দিয়ে দেন। আমার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি অবশ্যই ভিন্ন; তবে কী করে যে বলি, আমার ক্ষেত্রেও কোনো বিষয়বস্তুর প্রতি নিজের আগ্রহ জন্মানোর পেছনে যে কারণগুলো থাকে, সেগুলোও তো খামখেয়ালিপূর্ণ। অনেকবারই আমি তিনটি গল্পের মধ্য থেকে একটিকে বেছে নিয়েছি একেবারেই আকস্মিক কোনো কারণে- হঠাৎ লাফিয়ে উঠে ভেবেছি, এটি বিস্ময়কর হবে; কেননা, আগের রাতে নির্দিষ্ট একটি স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিংবা এটিকে ভালো মনে করেছি এই বিবেচনায় যে, এই সবিশেষ গল্পটিকে আমার নিজের ভেতর থেকেই সংযুক্তিপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।


