মাথাপিছু কার্বন নির্গমনে কাতার কেন বিশ্বে শীর্ষে?

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ মারাত্মক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) নির্গমন বিশ্বব্যাপী গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। দেশভিত্তিক নির্গমনের মাত্রা বিভিন্ন, আর এর মধ্যে কাতার প্রতি ব্যক্তি কার্বন নির্গমনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের অন্যতম।

কাতারের প্রতি ব্যক্তি কার্বন নির্গমন বিশ্বজুড়ে অন্যতম সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২২ সালের গড় হিসেবে কাতারবাসী প্রতি বছর প্রায় ৪৩.৬ টন CO₂ নির্গমন করে। এটি বিশ্বের গড় নির্গমনের প্রায় ৯ গুণ এবং উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অনেক বেশি। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের প্রতি ব্যক্তি নির্গমন মাত্র প্রায় ০.৭ টন এবং বিশ্বের গড় প্রায় ৪.৮ টন। কাতারের এই উচ্চ নির্গমন মূলত তার তেল ও গ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহারের কারণে।

কাতারের প্রতি ব্যক্তি কার্বন নির্গমনের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করে-

প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য: কাতার বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি তেল ও গ্যাস শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তেল-গ্যাস উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহন প্রক্রিয়ায় প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি পোড়ানো হয়, যা প্রচণ্ড কার্বন নির্গমন সৃষ্টি করে।

শক্তিশালী শিল্পায়ন ও অবকাঠামো: কাতারে আধুনিক নগরায়ন, বড় বড় নির্মাণ প্রকল্প এবং দ্রুতগতির শিল্পায়নের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার হয়।

গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া: কাতারের জলবায়ু অত্যন্ত গরম এবং শুষ্ক হওয়ায় সারাবছর এয়ার কন্ডিশনার ও কুলিং ব্যবস্থার চাহিদা থাকে। এই উচ্চ বিদ্যুৎ ব্যবহার কার্বন নির্গমন বাড়ায়।

জনসংখ্যা ও জীবনধারা: কাতারে বেশিরভাগ জনসংখ্যা বিদেশী শ্রমিক ও কর্মী যারা উচ্চ ভোগদখল করে, যার ফলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কার্বন নির্গমন বেড়ে যায়।

কাতার পরিবেশ রক্ষায় পদক্ষেপ নিচ্ছে। নবায়নযোগ্য শক্তি উৎসের উন্নয়ন এবং কার্বন শোষণের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

কাতার সরকার ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরশক্তি প্রকল্প অনুমোদন করেছে যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ বাড়াবে। ভবিষ্যতে এই পরিমাণ বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে অধিকাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে আসার লক্ষ্য রয়েছে।

জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে উৎপন্ন CO₂ গ্যাস পরিবেশে নির্গমনের পরিবর্তে জমা করার জন্য কাতার এই প্রযুক্তি ব্যবহার ও উন্নয়ন করছে।

কাতার আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তন নীতির মধ্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ করছে। জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন (COP) এ নিয়মিত অংশগ্রহণ এবং প্যারিস চুক্তির আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে CO₂ নির্গমন ২৫% কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে। কাতার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন তহবিলে অবদান রাখছে। জলবায়ু ও পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বে কাজ করছে। দেশের নীতি ও আইনসমূহ পরিবেশ বান্ধব করার প্রচেষ্টা চলছে।

এছাড়া কাতারের অর্থনীতি প্রায় সম্পূর্ণভাবে তেল ও গ্যাস শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এই শিল্প কার্বন নির্গমনের প্রধান উৎস।

তবে বর্তমান বিশ্বে টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য শক্তি ও সবুজ প্রযুক্তির দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কাতার সরকার বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং শিল্পায়নে পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে কাজ করছে।

কাতারের উচ্চ কার্বন নির্গমন বিশ্ব জলবায়ুর জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং ও জলবায়ু পরিবর্তনে কাতারের প্রভাব উল্লেখযোগ্য।

কাতার উচ্চ প্রতি ব্যক্তি কার্বন নির্গমনের কারণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের মধ্যে হলেও, নবায়নযোগ্য শক্তি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির গ্রহণে দেশটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে তেল ও গ্যাস খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই অর্থনীতির দিকে ঝুঁকতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন